Interior
Sananda fashion

শৈল্পিক অন্দরসাজ
অত্যন্ত আদর ও যত্নে সাজানো অদিতি ও জয়দীপ চক্রবর্তীর অন্দরমহল। পরিপাটি, মার্জিত, রুচিশীল।

g

অন্দরসজ্জায় অনেকটা জায়গা নয় বরং দরকার রুচিবোধ এবং সৃজনশীল ভাবনা। ইট কাঠের জঙ্গলে, এক চিলতে ফ্ল্যাটের মধ্যেও প্রকৃতির কাছাকাছি, প্রকৃতির পাশাপাশি বাস করা সম্ভব তা অদিতি চক্রবর্তীর অন্দরমহলে ঢুকলেই বোঝা যায়। কলকাতার উপকণ্ঠে ৭৪০ স্কোয়ার ফুটের একটি সাজানোগোছানো ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটটির অন্দরের প্রতিটি কোণায় ধরা পড়ছে রুচিবোধ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন। তাঁর বাড়িটি আসলে তাঁর নিজস্ব ভাবনাচিন্তার ফসল। অদিতি নিজে একজন শিল্পী। তিনি ছবি আঁকেন, গয়না তৈরি করেন, স্কাল্পচারেও তাঁর আগ্রহ আছে। তাই বাড়িটিকে অনায়াসে তাঁর শিল্পীসত্তার এক্সটেনশন বলা যেতে পারে। আসলে ইন্টিরিয়র ডেকরেশনের মাধ্যমে ফুটে উঠতে পারে একজন মানুষের পার্সোনালিটি। ফ্ল্যাটটি ছোট হলেও তার মধ্যেই অদিতি সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর অন্দর। অন্দরসজ্জার উপকরণগুলির মধ্যে প্রধান কাঠ এবং মেটাল। “আমি কাঠ ভীষণ ভালবাসি। প্লাইউডের ফার্নিচার আমার একদম ভাল লাগে না। তাই আমার বাড়ির সব ফার্নিাচারই কাঠের। কাঠের মধ্যেও আমার বেশি পছন্দ একটু গাঢ় রঙের কাঠ। তাই আমি ফার্নিচারের ক্ষেত্রে মেহগিনি ফিনিশটাই প্রেফার করি।” ঘরে ঢুকেই ড্রয়িংরুম। মেহগিনি ফিনিশের কাঠের সোফাসেটের উপর অদিতির নিজের হাতে তৈরি কুশান কভার। গাঢ় সবুজ রঙের সোফার উপর রিচ ভাইব্র্যান্ট হলুদ কুশান ঘরকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। সোফার ঠিক পিছনের দেওয়ালে কেরল মুরালের ৪ ফুট বাই ৫ ফুটের এক বিশাল পেন্টিং। এটিও গৃহকর্ত্রীর নিজের হাতেই আঁকা। পেন্টিংয়ের দু’পাশে দুটি লম্বা উড ওয়র্ক। এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। সোফার আর এক দিকের দেওয়ালে বড় নিচু জানলা। অদিতির ভাবনাতেই জানলাটা নিচু করে করা হয়েছে। জানলা জুড়ে একরাশ গাছগাছালি। “আসলে আমাদের কোনও বারান্দা নেই। তাই এই জায়গাটা এমন ভাবেই বানিয়েছি যাতে বারান্দার মতো একটা ফিলিং আসে।” আর পুরো বাড়িতে যদি তাঁর কোনও পছন্দের কর্নার থাকে, তাহলেও এটিই। কারণ? তাঁর কথায়,“এই জায়গাটিতে বসলে বাইরের প্রকৃতি দেখা যায়। আকাশ দেখা যায়।” জানলায় সাদা নেটের পরদা। ফলে ঘরে আলো বাতাসের কোনও অভাব নেই। তাছাড়া গিন্নির ভারী কাপড়ের পরদা না পসন্দ। প্রকৃতি যত ঘরের ভিতর ঢুকে আসে ততই যেন ভাল! জানলার কাছেই সিলিং থেকে নেমে এসেছে দুটি হ্যাংগিং লাইট। সেই জানলার গা ঘেঁষে একটি লো সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট। গৃহকর্ত্রী জানালেন, “আসলে আমাদের ফ্ল্যাটটা ছোট। তাই আমি এমন ফার্নিচারই বেছে নিই যা ছোট অথচ ইউটিলিটি আছে। যেমন এই বসার জায়গার নীচটা কভার করা, যা স্টোরেজ হিসেবে কাজে লাগানো যায়।” অদিতির অন্দরের মধ্যে যে বিষয়টা নজর কাড়বেই তা হল সবুজের সমারোহ। গোটা ড্রয়িংরুম জুড়ে নানারকমের ইন্ডোর প্ল্যান্ট। বাগানের এফেক্ট দেওয়ার জন্যই এধরনের ডেকরেশন। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় সযত্নে লালিত। তবে শুধু যত্ন নয়, নজর দেওয়া হয়েছে সজ্জার উপরও। গাছ তো মাটির টবে রাখতেই হবে। কিন্তু অদিতি টবগুলো কোনওটা রেখেছেন পিতলের সাজিতে কোনওটা আবার পানদানিতে। এই ছোটছোট ভাবনার মধ্যেই ঘর সাজিয়ে তুলেছেন একেবারে নিজের মতো করে। “আমি বোটানির স্টুডেন্ট। গাছ আমি ভীষণ ভালবাসি। এবং যত্নও করি। একটা নতুন পাতা বেরোলেও আমার দারুণ আনন্দ হয়। আমার একটা বড় অ্যাডভানটেজ আমার ঘরগুলি দক্ষিণ উন্মুক্ত। তাই আলো বাতাসের কোনও অভাব নেই।” সোফার সামনেই একটা ষড়ভুজাকৃতি টেবল। উপরে ডোকরার কাজ করা। সলিড উডের সাবেকি চেহারা, অথচ সিম্পল, সুন্দর ফিনিশিং, ল্টাইলিশ লুক এবং ছোট জায়গার জন্য একেবারে আদর্শ। সোফার পাশে রাখা একটা ছোট্ট সাইড টেবল। তার উপর মেটালের বেশ কিছু শো পিস। এগুলো সবই আদিবাসী সংস্কৃতির উপর তৈরি। অদিতির কথায়, “ভারতীয় লোকশিল্পের প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ। তাই ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে ওই আদিবাসী ছোঁয়াটা রাখতে চেয়েছি। আমার ঘরের পেন্টিং এবং শোপিসে তাই ফোক কালচারেরই আধিক্য। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেলা বা এক্সিবিশন থেকে কিংবা কোথাও ঘুরতে গেলে এই ধরনের জিনিস সংগ্রহ করি।” ঘরের চারদিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। ঘরের এক কোণায় বেশ বড় মাপের পুরনো আমলের ঝোলানো গোল ঘড়ি। পাশেই মেটালের বুদ্ধ মূর্তি। অদিতি যেমন শিল্পের অনুরাগী তেমনই নিজেও ভাল শিল্পী। ঘরের একটা দেওয়াল জুড়ে শুধু তাঁরই হাতে আঁকা ছবির কালেকশন। এখানেও সেই আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে। এই সবকটি ছবিই মধ্যপ্রদেশের গোন্ড আধিবাসীর অঙ্কনরীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। মূলত পশুপাখিরই ছবি। সেই ভাবধারাতেই অদিতি সাজিয়েছেন তাঁর দেওয়াল। অদিতি চিত্রশিল্পী হওয়ার পাশাপাশি পুজোর থিম আর্টিস্ট হিসেবে আবার জুয়েলারি ডিজ়াইনও করেন। ফলে লোকজনের আনাগোনা লেগেই থাকে। তাই অতিথি আপ্যায়নের জন্য একটা ছোট্ট জায়গা করেছেন তিনি। দেওয়াল ঘেঁষা ছোট টেবল, তাকে ঘিরে তিনটি চেয়ার। টেবল লাগোয়া দেওয়ালটি ভারী সুন্দর। দেওয়ালের মাঝে আয়না, তার দু’পাশে এবং উপরে একটি শেলফ। এখানে নানা ধরনের শো পিস রাখা। আর একটু সবুজের ছোঁয়াও যে আছে তা বলাই বাহুল্য! ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বেডরুম। বেডরুমের সজ্জায় কোনও আতিশয্য নেই। ঘরের দু’দিকে জানলা। জানলার বাইরে প্রচুর সবুজ। জানলার নীচে অদিতির সাধের কিছু ইন্ডোর প্ল্যান্ট। একদিকে বড় বেড অন্যদিকে বেশ বড় মাপের ড্রেসিং টেবল। এই ফার্নিচারের জিজ়াইনও অদিতির নিজের করা। বাড়ির চারিদিকে ছড়িয়ে আছে নানা প্রাদেশিক কালেকশন। লোকাল ফোক আর্টের সৌজন্যে, সবুজের সমারোহে তাঁর বাড়ির অন্দরমহল পেয়েছে এক ইউনিক টাচ!

facebook
facebook