Interior
Sananda fashion

বর্ণময় বাড়ি

আর্কিটেকচার, আসবাব, রং, সবেতেই স্ক্যানডিভিনিয়ান যাপনচিত্রের ছোঁয়া। প্রথম দর্শনেই তৈরি হয় ভাললাগা, মুগ্ধতা। এই অন্দরমহলের কারিগর কিরণ সিংহরায়।

g

ঠিক ছবির মতো। সাদা রঙের প্রেক্ষিতে রঙিন আসবাব, আপহোলস্ট্রি। অন্দরসাজের শিল্পীত ভাষা-ব্যকরণ বোধহয় এমনই হয়। অথচ এ যেন ফ্ল্যাটের আয়তন খুব একটা বেশি নয়। আর সেখানেই তো চমক। ছোট্ট জায়গার যে উষ্ণতা, যে আদুরেপানা আছে, তা বজায় রেখেই এই অন্দরসাজ। নিজের বাড়ির স্বপ্ন বহুদিনের, ফলে সেই ইচ্ছে বাস্তবে রূপান্তরিত হতেই একেবারে মনের মতো গুছিয়ে নিয়েছেন। আমরা অনেকেই ছোট জায়গা নিয়ে হা পিত্যেশ করি, খালি মনে করি ইশ! আর একটু যদি জায়গা পেতাম। কিন্তু এই আক্ষেপ সত্যি অর্থহীন। ভেবেউ দেখুন না, যেমন আপনার ক্যানভাস, আপনি তো তাকে সেভাবেই সাজাবেন, রঙে, রেখায় ভরিয়ে তুলবেন। আর এখানেই তো আপনার মুনশিয়ানা। আর এমনটাই মনে করেন কিরণ সিংহরায়। ৭০০ স্কোয়ারফিটের ফ্ল্যাট নিয়ে বিন্দুমাত্র আপশোষ নেই। কর্মসূত্রে বহুদিন ধরে বিদেশবাসী। আমস্টারডামে থাকেন। ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁপ ধরে গিয়েছিল। তখন থেকেই নিজের এই বাড়ি কেনার পরিকল্পনা। আমস্টারডামের লাতিন কোয়ার্টার দে পিপ-এ এই বাড়ি। এই বাড়িতে একটাই বেডরুম। তাই আসবাবের বেশি ভিড় নেই। আর ঠিক এমনটাই তো হওয়া উচিত। আয়তন বুঝেই আপনাকে আসবাব নির্বাচন করতে হবে। আর এখন তো স্পেস সেভিং ফার্নিচারের যুগ।

স্লিক, দেখতে স্মার্ট আবার ফাংশনাল। আসলে ছোট জায়গা সাজাবার কৌশল লুকিয়ে আছে এর মধ্যেই। যত মাল্টিপারপাজ় আসবাব ব্যবহার করবেন, তত জায়গা বাঁচবে আর বড়ও দেখাবেয় কমফোর্ট, স্টাইল, ব্যালেন্স আর ফাংশনালিটি, এই হবে আপনার অন্দরমহল সাজোনোর প্রধান অস্ত্র। ঠিক সেই কথাই মাথায় রেখে কিরণ নিজের বাড়ির আসবাব বেছেছেন। অনলাইন কিনেছেন কিছু আবার কিছু দোকান ঘুরে ঘুরে কিনেছেন।কাস্টোমাইজ়ও করিয়েছেন প্রয়োজন বুঝে। ঢুকেই ‘এল’ শেপের ড্রয়িং-ডাইনিং এরিয়া। লম্বাটে দিকে ডাইনিং অ্যারেঞ্জমেন্ট (পাশের ছবি)। একা থাকেন তাই বৃহদাকার টেবল না রেখে, ছোট্ট কাঠের টেবল আর দু’টো চেয়ার রেখেছেন। আর আছে কালো-সাদা ডোরাকাটা গদিআঁটা বে়ঞ্চি। বাড়তি লোক এলেও সমস্যা নেই, আর প্রয়োজন না পড়লে ওটাই চলে যায় ড্রয়িং এরিয়ায়। ছোট জায়দায় এরকম ‘মুভেবল’ আসবাব রাখাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। খাওয়ার জায়গার মুখোমুখি ওপেন কিচেন। ছোট্ট জায়গাকে দারুণবাবে কাজে লাগানো হয়েছে। আর পরিষ্কার রাখতে পুরোটাই ক্যাবিনেট স্টাইল। বাসনকোসনের ভিড় নেই, কোথাও ভিজে কাপড়ের টুকরো বা ন্যাকড়া দেখা যায় না। সবটাই আলমারির অন্তরালে। পাশের ছোট্ট টুলে টোস্টার আর কাটলারি রাখা। আর একদিকে দেওয়াল আনমারির ভিতরে কনসিলড আভেন, বার্নার ও বাকি অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট। ক্যাবিনেট করিয়েছেন বলে খুব পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন লাগে। ওপেন কিচেনের এই স্টাইলটা আপনারাও করতে পারেন। জায়গা কম লাগবে আর পরিষ্কারও দেখাবে। এল শেপের চও়ড়া দিকে বসার ব্যাস্থা। একদিকে আরামদায়ক ছাই রঙের লম্বাটে সোফা, আর একদিকে কটকটে হলুদ রঙের আরামদায়ক আর্মচেয়ার। রঙিন কুশনের সুন্দর ব্যবহার। কাঠের মাটিতে ছাই, কালো শতরঞ্চির উপর হলুদ প্রিন্টেড ফ্লোর কুশন। আড্ডা দেওয়ার অব্যর্থ প্রেক্ষিত। স্ক্যানডিভিয়ান সিগনেচার স্টাইলের সাক্ষর বলতে পারেন। সুরুচির অভিজ্ঞান এই অন্দরমহল। দেওয়ালে সাইকেলের ছবি সাজানো। আসলে এখানে সাইকেল ছাড়া একেবারেই ভাবা যায় না। দোকানপাট, বাজার, এমনকী অফিসের জন্যও এই সাইকেল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বাহন। কিরণ নিজেও সাইকেলের পরম ভক্ত। নিজের টুকটুকে লাল সাইকেল ছাড়া ভাবতেই পারেন না। এই ছবি সেই ভালবাসাকেই বোঝাতে। আসলে বাড়ি মানেই তো নিজেদের ভাললাগা, অনুরাগ, ইচ্ছেগুলোকে প্রতিফলিত করার ক্যানভাস। নেহাতই ইট কাঠের বাসস্থান নয়, অন্তরমহলের প্রতিবিম্ব। লিভিং রুমের আর এক দিকে দেওয়ালে ঠেস দেওয়া ডিভান। সাদার ব্যাকগ্রাউন্ডে রঙিন, উজ্জ্বল বেডস্প্রেড ও কুশন। যেন আমস্টারডামের ‘দে পিপ’-এর বোহেমিয়ান জীবনের বর্ণময় জলছবি। মাটিতে লাল শতরঞ্চির যোগ্য সঙ্গত। ড্ভান খিলে দিলেই দিব্যি শোওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। মাল্টিপারপাজ় আসবারের এইটাই তো সুবিধে। নিজের বাড়িতেও আপনারা ভেবে দেখতে পারেন।

লিভিং রুমের লাগোয়া লম্বাটে বারান্দা। কাচের দরজা পেরিয়ে বাইরে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে যায় গাছগাছালিতে ভরা সুন্দর, শান্ত পরিবেশ। মন ভাল হয়ে যায় নিমেষে। এক কোণে অতি প্রিয় সাইকেল রাখা। রান্নাঘর পেরিয়ে একফালি প্য়াসেজ। সেখানেই বাথরুম কাম ড্রেসিং ইউনিট। আর প্যাসেজের শেষে বেডরুম। দেওয়াল জুড়ে কাচের জানলা। আর তাতে ধবধবে সাদা পরদা। সিঙ্গল বেড আর আয়না বসানো দেওয়াল আলমারি। জায়গা বাঁচাতে স্লাইডিং ডোর। আর একদিকে কাঠের ডার্ক পলিশ করা ছোট্ট রাইটিং ডেস্ক। আসবাবের কোনও ভিড় নেই। ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই ঠাঁই পেয়েছে এই বাড়িতে। আসলে আমরা অনেকসময় প্রয়োজনের কথা মাছায় না রেখেই বাড়ি অতিরিক্ত জিনিসপত্রে ভরিয়ে ফেলি। আর তারপর আবর্জনা সাফ করতে করতেই অর্ধেক সময় চলে যায়। অথচ প্রথম থেকেই যদি মাথা খাটিয়ে, পরিকল্পনামাফিক বাড়ি সাজাতে পারেন, দেখবেন ছোট্ট জায়গাই হয়ে উঠছে পরম সুন্দর। তাই হেলাফেলা না করে, আয়তন নিয়ে মন খারাপ না করে, ভালবাসা, মায়ায় গড়ে তুলুন আপনার অন্দরমহল।

facebook
facebook