Interior
Sananda fashion

আরামের আস্তানা

সবুজের বিস্তৃতির মাঝে খোলামেলা পরিবেশ। প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে অনন্য রং, রেখা। শিল্পী গৌতম দাসের অন্দরমহল সত্যিই আরামের আস্তানা।

g

শান্তিনিকেতনের শ্যামবাটি। লালমাটির রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোতে থাকলে এ বাড়ি চোকে পড়বেই। সবুজ মখমলি গালিচার ঢেউ খেলানো ল্যান্ডস্কেপিং এই অঞ্চলে খুব একটা চোখে পড়ে না। সকালের আলোয় ছবি তুলব বলে হাজির। ফোটোগ্রাফার ক্যামেরা রেডি করতেই সবুজ ঘাসের উপর ছায়ার কাটাকুটি খেলা শুরু। এ বাড়ির ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্দরে শুধুই রঙের ছোঁয়া, প্রাণের পরশ, জীবনের আশ্বাস। সেটাই তো স্বাভাবিক। গৃহকর্তা শিল্পী। ছবি আঁকেন, সেরামিকের স্কাল্পচারে সিদ্ধহস্ত। তাঁর রঙিন মনের মাধুর্য ঢেলে সাজিয়েছেন এই বাড়ি। লোহার গেট পেরিয়ে পরিচ্ছন্ন ও ওয়েলমেনটেনড ল্যান্ডস্কেপে এ বাড়ির গল্প শুরু। মোরাম বিছানো পথের দু’দিকে সাজানো বাগানে পলাশ, খেজুর, অলিভ, নানা গাছগাছালির উঁকিঝুঁকি। কান পাতলেই শোনা যায় নাম না জানা অসংখ্য পাখির সুরেলা সিম্ফনি। কিছুটা এগোলেই চোখে পড়ে বিশাল ১৫ কাঠা জমির উপর ধবধবে সাদা বাংলো। অনেকটা কটেজ স্টাইলের, বিস্তৃত। বাংলোর বাঁদিকেই ওপেন অ্যাকোরিয়াম। কাঁচের দেওয়াল দিয়ে দেখা যায় পরম নিশ্চিন্তে নীল জলে ভেসে বেড়াচ্ছে লাল, নীল, সোনালি মাছ। দেখেই হাঁপিয়ে ওঠা মন ভাল হয়ে যায়। বাড়ি তো সত্যিই এমনই হওয়া উচিত, যেখানে খিটখিটে মেজাজ, ক্লাম্ত মনও নিমেষে ফুরফুরে হয়ে ওঠে। তবেই না অন্দরমহল প্রকৃত রূপে হয়ে ওঠে ভাল থাকার নিশ্চিন্ত ঠিকানা।

মূল বাড়িতে ঢোকার জায়গাটিও ভারি চমত্‌কার। দু’ধারে প্যানজ়ি, ফ্লকস, নানারকম পাতাবাহারের সারি। ঠিক যেন সবুজ ক্যানভাসের উপর রঙের ছটা। দুধ সাদা মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই চোখে পড়ে দু’দিকে রাখা বেতের চেয়ার। শীতকালের মিঠেরোদ মাখতে মাখতে চায়ে আয়েসি চুমুক দেওয়ার জন্যে একেবারে আদর্শ। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রশস্ত বসার ঘর। কোথাও সাজো সাজো রব নেই, ছিমছাম পরিপাটি, রুচিশীল। সাদা রঙের চোখ জুড়ানো উপস্থিতির মাঝে এক ফালি টোরাকোটার দেওয়াল আলাদা করে আকর্ষণ করে। আর হবে নাই বা কেন, আর পাঁচটা টেরাকোটার কাজের থেকে আলাদা। বাড়ির সঙ্গে জুড়ে নানা স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে রাখা আছে এখানে। বহু বছরের পুরানো গাছ বা প্রিয় কুকুরের অনুকৃতি এই দেওয়ালের বিশেষত্ব। দেওয়ালের পাশের র্যাকে নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা ছোট ছোট আর্টিফ্যাক্ট সাজানো। আছে অভিনব ল্যাম্পশেড। শিল্পী নিজেই বানিয়েছেন। দোতলার মুখেই আছে এক আশ্চর্য অ্যান্টিক ঘড়ি। লন্ডন থেকে আনা। একদিকে সময় দেখায়, আর এক দিকে তাপমাত্রা। ঘড়ির পাশেই স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রার আঁকা অ্যাক্রিলিক ছবি। দু’জনেই শিল্পী মনের মানুষ, তাই আর্টের কদর করেন। তাই অন্দরে দেখতে পাওয়া যায় যোগেন চৌধুরী ও অন্যান্য বিশিষ্ট শিল্পীদের আঁকা ছবি।

বসার জন্যে চিরাচরিত সোফার জায়গায় আছে ছোট চৌকি। তারই উপর সাজানো রংবাহারি কুশন। জিনিসপত্রের ভিড় নেই। বসার ঘরের একদিকে ডায়নিং ইউনিট। কোনও আলাদা পার্টিশন নেই। ‘বাড়ি বানাব যখন ঠিক করি, তখন জানতাম আর যাই হোক পায়রার খুপরি বানাব না। বহুবছর এডিনবার্গে ছিলাম। সেখানকার কান্ট্রিসাইড আমাকে মুগ্ধ করত। তারই কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমাদের এই বাড়িতে।’ জানালেন গৃহকর্তা।

বসার ঘর থেকে এক ধাপ নেমে লাগোয়া আড্ডা জ়োন। বার-বে-কিউয়ের ব্যবস্থা আছে। নরম গা ডোবানো সোফায় বসে ঝলসানো চিকেনে স্বাদে গন্ধে ডুবে আড্ডা মারা যায় দিব্ব্যি। জানলার ঠিক বাইরে আছে শিল্পীর সেরামিক স্টুডিও। এখানে বসেই তৈরি করেন অভিনব সেরামিক স্কাল্পচার। আদলটা অনেকটা কুঁড়েঘরের মতো। পুরোটাই ব্রিক ফিনিশ। আলাদা কোনও প্লাস্টার বা রঙ নেই। দেখতে ভীষণ ইন্টারেস্টিং লাগে।

বসার ঘর থেকে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। এখানেই শোওয়ার ঘর। কোনও বাহুল্য নেই। বড় বড় জানলা দিয়ে বাইরের সবুজ দেখতে ভারি ভাল লাগে। আসলে অন্দরসাজে মানেই জাঁকজমক, আড়ম্বরপূর্ণ আসবাবপত্রের ভিড় নয়। অন্দরসাজ তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন বাড়ির মানুষদের দিনলিপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। এই বাড়ি তেমনই এক আশ্রয়। প্রাকৃতিক সারল্যে ভাল থাকার নিশ্চিন্ত ঠিকানা!

facebook
facebook