vvvv
Interior
Sananda fashion

পুরনো সেই দিনের কথা..

সাবেকি রূপ, গন্ধের মাহাত্ম্য এখানেই, যে কখনওই পুরনো হয়না। এর একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আর সেই সৌন্দর্যেই বিলীন এই বাড়ির অন্দরমহল।

g

কলকাতার অন্যতম ব্যস্তবহুল অঞ্চল। দিন-রাত গাড়ির কলরব, লোকজনের ভিড়। তারই মাঝে নিশ্চিন্ত আরামের ঠিকানা। বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট, কিন্তু শুধুই ইট, বালি, সুঁড়কির ফ্রেমওয়র্ক মনে হয় না। এই অন্দরে প্রাণের পরশ, ভালবাসার স্পর্শ আছে। আসলে বাড়ি তো শুধুই কিছু নির্বাক আসবাবের সমষ্টি নয়, বাড়ির বাসিন্দাদের মননের প্রতিবিম্ব। আর ঠিক এমনটাই মনে করেন গৃহকর্ত্রী। নিজে যতটা রুচিশীল, সফিস্টিকেটেড, বাড়িও সাজিয়েছেনে একই সুরে। দেশে-বিদেশে ঘুরেছেন, আবার নিজের শিকড়ের প্রতি রয়েছে অগাধ আস্থা। বাড়িতেও তাই আধুনিকতার সঙ্গে সসম্মানে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিকতা। পুরনো জিনিসের প্রতি আলাদা ভাললাগা যেমন আছে, তেমনই ফাংশনালিটির সঙ্গে আপোষ করতে চাননি। পুরনো বনেদি কলকাতার সঙ্গে নাড়ির টান আছে বলেই অন্দরমহলে সেই নস্টালজিয়ার ছবি পাওয়া যায়।

দরজা দিয়ে ঢুকেই সোজাসুজি লম্বা করিডোর। শেষে টুকটুকে লাল দেওয়ালে গণেশের ছবি। সোজা এগোলেই ডানদিকে লম্বা দেওয়ালে একধিক আঁকা চবি ফ্রেমবন্দি করে সাজানো আছে। ছবির নীচেই পুরনো আমনের ট্রাঙ্ক রাখা। ‘পুরনো সাবেকি জিনিসের একটা আলাদা চার্ম আছে। আমার গোটা বাড়িতেই একটা ভিনটেজ, কলোনিয়াল ফ্লেভার পাবেন। ট্রাঙ্কটা কিনেছিলাম কলকাতার সিক্কা প্যালেস থেকে। এত রকমের অ্যান্টিক আর কোথাও দেখিনি।” জানালেন বাড়ির মালকিন। রাজস্থানি অনের্ট করা আছে ট্রাঙ্কটার গায়ে। টিক তার পাশের থাইল্যান্ড থেকে আনা বৌদ্ধ ভিক্ষুকের মূর্তি। দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটা জিনিসই এখানে খুব সুন্দর করে সাজানো আছে। মজার বিষয় কোনওদিনও প্যাকার্স ও মুর্ভাসদের ভরসায় এই পরম প্রিয় জিনিসগুলো নিয়ে আসেননি। নিজেরাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। “আমাদের প্যাশন দেখে অনেক সময় এয়ারলাইনের লোকেরা হ্যান্ড লাগেজে আমাদের এসব জিনিস আনতে দিয়েছে, বাঁধা দেয়নি। এ বাড়িতে যা কিছু দেখবেন অধিকাংশই আমরা নিজেরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।” মুখে-চোখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে জানালেন গৃহকর্ত্রী। দেওয়াল ধরে এগোলেই ডানডিকে ডাইনিং এরিয়া, বঁিদেকে বসার ব্যবস্থা। মাঝে পিলার ও আর্চ দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। বেশ একটা উত্তর কলকাতার বাড়ির মতো দেখতে লাগে। বসার জায়গায় আঝুনিক আসবাব যেমন আছে, তেমনই ভিনটেজ কাঠের সেন্টার টেবল, কর্নার টেবলও জায়গা করে নিয়েছে। দুধ সাদা গা ডোবানো আরামদায়ক সোফা আর পুরনো আমলের সেন্টার টেবলে একটা অদ্ভুত কনট্রাস্ট তৈরি করে। সোফার ঠিক উপরের দেওয়ালে অগুনতি কাঠের ফ্রেমবন্দি করা ছবি। আর্টের বিশেষ অনুরাগী বলেই বিভিন্ন সময়ে শিল্পী বন্ধুবান্ধবরা উপহার দিয়েছেন এই সব ছবি। “আগে আমাদের এত টাকা ছিল না যে এই ধরনের ছবি কিনতে পারতাম। কিন্তু ভালবাসাটা আমাদের অনেকদিনে। মনে আছে একবার ফাল্গুনি দাশগুপ্তের একজ়িবিশনে দেখেছিলাম। ওঁর স্কেচ দেখে আমি তো মুগ্ধ। কিন্তু কেনার ক্ষমতা ছিল না। উনি বোধহয় আমার করুণ অবস্থাটা বুঝতে পারেন। সঙ্গে করে ওঁর গ্যালারিতে নিয়ে যান। আর নামমাত্র মূল্যে কিছু ছবি আমাকে দেন। আমার কাছে এগুলো তাই অন্যতম উপহার।” বোঝাই গেল পুরনো স্মৃতির রোমন্থন করতে পেরে বেজায় খুশি। ছবি দেখা গেল ডাইনিং এরিয়ার দেওয়ালেও। বিশাল বড় বড় ক্যানভাসের সঙ্গে মানিয়ে যেন রাখা হয়েছে আসবাব। ছোট্ট কাঠের গোল টেবল, তার সঙ্গে পুরনো আলের কারুকাজ করা চেয়ার। ঠিক যেন কোনও সাদাকালো সিনেমার দৃশ্য। সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত ঝাড়লন্ঠনের স্নিগ্ধ হলুদ আলো।

বাড়িতে ঘরের সংখ্যা মোট চার। মাস্টার বেডরুমে ঢুকলেই মনে হয় যেন অন্তত দু’দশক পিছেয়ে গেছেন। ঘরের সমস্ত আসবাবেই একটা পুরনো মেজাজ, গন্ধ আছে। সে ইংলিস পোস্টার বেডই হোক কিংবা কাঠের ফ্রেমের জানলা। হাতল দেওয়া একটা আরামকেদারাও আছে। ঠিক যেমনটায় বসে হুকোয় টান দিতেন জমিদাররা। সানেই কোচি থেকে আনা অ্যান্টিক হোপ চেস্ট। কেরলের ট্র্যাডিশনাল এই ট্রাঙ্কে আগেকার দিনে যৌতুকের সমস্ত সামগ্রী ছেলের বাড়ি পাঠানো হত। দেখতে তো সুন্দর লাগেই আবার স্টোরেজের জন্যেও দারুণ। অন্দরমহলের অন্যান্য অংশের মতো এই ঘরেও দেওয়াল জুড়ে ছবি। কোনওটা হাতে আঁকা, কোনওটা আবার লিথোপ্লেটের উপর প্রিন্টিং। ঘরে আলো বলতে কলোনিয়া ঝাড়লন্ঠন। ইলেকট্রিকের হলেও দেখতে একেবারে তেল দেওয়া লন্ঠনের মতো। এমনকী টেবলল্যাম্পের আকারও লন্ঠনের মতোই। বাড়ির অন্য ঘরেও একইরকম সনাতন আমেজের আভাস। তবে ব্যতিক্রম ফ্যামিলি রুম। এ ঘরে সবই কনটেম্পোরারি, সোফা থেকে শুরু করে টিভি ইউনিট, সেন্টার টেবল। দেওয়ালে ছবি আছে অবশ্যই তবে পেন্টিং নয়, পারিবারিক অ্যালবামের কোলাজ। “আমি ট্র্যাডিশনাল জিনিস যতটা পছন্দ করি, ততটাই ফাংশনালিটি আমার কাচে গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘরটায় আমরা প্রচুর সময় কাটাচ্ছি। গল্প, আড্ডা, টিভি দেখা সবই এখানে। ফলে চেয়েছিলাম এমনভাবে সাজাবো যাতে দেখতে ক্লামজ়ি না লাগে অথচ কমফর্টেবলও হয়।”

এই বাড়ির আর একটা ইন্টারেস্টিং অংশ। বারান্দা। আর পাঁচটা বারান্দার থেকে অনেকটাই আলাদা। পুরোটাই কাচে ঘেরা সিট আউট এরিয়া বলা যায়। ঝকঝকে মাটির উপর সাহারনপুর থেকে আনা লাল কার্পেট। একদিকে দিদিশাশুড়ির থেকে পাওয়া কাঠের সোফা, অন্যদিকে ঠাকুরদার দেওয়া কাঠের টেবল, সিলিংয়ের আবার কড়িবর্গার মতো কাঠের পাটাতন। বারান্দার এ হেন রূপ কল্পনাই করা যায় না। মনে হয় টাইম মেশিনে করে বেশ অনেকটা সময় পিছিয়ে গেছেন। আসলে সাবেকি রূপ, গন্ধের মাহাত্ম্য তো এখানেই, কখনওই পুরনো হয়না। এর একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আর সেই সৌন্দর্যেই বিলীন এই বাড়ির অন্দরমহল।
ছবি: সুপ্রতীক চট্টোপাধ্যায়

facebook
facebook