Monemone
Sananda fashion

বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজ়অর্ডার

বর্ডারলাইন ব্যক্তিত্বের মানুষদের যে কোনও আচরণেই একটা বাড়াবাড়িভাব লক্ষ করা যায়। এই নিয়ে রইল একটি আলোচনা।

g

আমার ছেলের বয়স ২৩। আমাদের পরিবারে ও একমাত্র ছেলে সন্তান। বিয়ের পর থেকে আমি জয়েন্ট ফ্যামিলিতে আছি। আমার ছেলে ছোট থেকেই খুব আদরে মানুষ হয়েছে। জন্মের পরই আমার ছেলের অ্যাজ়মা ধরা পড়ে। ফলে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ওর ব্যপারে অত্যাধিক সচেতন হয়ে ওঠেন। তাঁরা কখনওই ওকে শাসন করতে দেননি। আমি ওকে বকলে তাঁরা আমাকে সবসময় বাধা দিতেন। এমনকী ওর সামনেই আমার উপর চোটপাট করতেন। আমি খুব একটা প্রতিবাদ করতে পারিনি। ছেলেও ছোট থেকেই খুব অবাধ্য হয়ে ওঠে। এখন ওর একজন গার্লফ্রেন্ড আছে, যার সঙ্গে ঝগড়া লেগেই থাকে। সম্প্রতি ওর সঙ্গে ঝগড়া করে আমার ছেলে নিজের হাত কেটে ফেলেছে। আমি শুনেছি আমার ছেলে ফোনে ওর গার্লফ্রেন্ডকে সবসময় আত্মহত্যা করার হুমকি দেয়, যাতে ওর গার্লফ্রেন্ড ওকে ছেড়ে যেতে না পারে। ও অন্য কারও সঙ্গে কথা বলছে কি না দেখার জন্য কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর ওকে ফোন করে। যদি কখনও গার্লফ্রেন্ডের ফোন ব্যস্ত থাকে, প্রচণ্ড অশান্তি করে, জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে। যতক্ষণ না ওর গার্লফ্রেন্ড ক্ষমা চায়, ততক্ষণ খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। কীভাবে ছেলেকে সামলাবো বুঝতেই পারছি না।
শিবানী হালদার, বেহালা

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ থাকেন যাঁদের আচরণ বেশ অস্বাভাবিক। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ খামখেয়ালি, বদমেজাজি, একগুঁয়ে, কেউ আবার অহঙ্কারী, অন্যদের আঘাত আর সমালোচনা করতেই তাঁদের সুখ। কেউ আবার সবসময় নেগেটিভ চিন্তাভাবনা করেন অথবা সব ব্যাপারেই পরনির্ভরশীল। এঁদের সঙ্গে অন্য মানসিক রোগীদের প্রধান পার্থক্য, এঁরা কখনওই নিজেদের অসুস্থ বলে মনে করেন না। ফলে নিজেদের আচরণ সংশোধন করার কোনও চেষ্টাই করে না। এঁদের অনেকেই আসলে পার্সোনালিটি ডিজ়অর্ডার বা ব্যক্তিত্বের বিকারে আক্রান্ত। আপনার ছেলেকে এঁদের দলেই ফেলা যায়।

আপনার ছেলের আচরণের যে বর্ণনা আপনি দিয়েছেন তাতে ওর সমস্যাটাকে বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজ়অর্ডার-এর মধ্যে ফেলা যেতে পারে। এর প্রধান উপসর্গ আবেগের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। যাঁরা কখনও অবসাদ আর কখনও উত্তেজনা অর্থাৎ বাইপোলার মুড ডিজ়অর্ডারে ভোগেন তাঁদের সঙ্গে আপনার ছেলের আচরণের যথেষ্ট মিল রয়েছে। বর্ডারলাইন ব্যক্তিত্বের মানুষদের যে কোনও আচরণেই একটা বাড়াবাড়িভাব লক্ষ করা যায়। যাঁকে পছন্দ তাঁর জন্য এঁরা সবকিছু করতে চান। আবার তাঁর আচরণে সামান্য ত্রুটি দেখলেই তাঁকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেন না। যেহেতু এঁরা সবসময় অন্যদের কাছ থেকে নিঃশ্বর্ত আনুগত্য আশা করে, কারওর সঙ্গেই এঁদের বন্ধুত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয় না। বাবা-মা বা দাদা-দিদির মতো কাছের মানুষ যাঁরা এঁদের ছেড়ে যেতে পারেন না, তাঁদের সবসময় তটস্ত হয়ে থাকতে হয়। এঁদের মেজাজ-মর্জির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বর্ডারলাইন ব্যাক্তিত্বের ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় আত্মহননের হুমকি দেয়। হাতের শিরা কেটে কিংবা ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টাও করে। অবসাদ থেকে যে এরা এমন করে তা বলা যাবে না। আত্মহত্যার চেষ্টা করার প্রধান উদ্দেশ্য অন্যকে বাগে আনা বা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করা। সেদিক থেকে এঁদের আচরণকে ব্ল্যাকমেল হিসেবে ধরা যেতে পারে।

আপনার ছেলের বিকারগ্রস্ত আচরণের পিছনে আপনাদের যৌথ পরিবারের সিনিয়র সদস্যরা যে কিছুটা হলেও দায়ী তা অস্বীকার করা যাবে না। কোনও যৌথ পরিবারে একটি মাত্র শিশু যখন বড় হয়, স্বভাবতই সে অনেকের নজরের মধ্যে থাকে। তাছাড়া ছোটবেলার অ্যাজ়মার কারণেই ও বাড়তি প্রশ্রয় পেয়েছে। অনেক যৌথ পরিবারে ডিসিপ্লিনের সমস্যা থাকে। ছেলে বা মেয়ে অন্যায় করলে বাবা-মা বকাবকি করলে দাদু-ঠাকুমা বাধা দেন। এতে শিশুটির মধ্যে ন্যায় অন্যায় বোধটাই তৈরি হয় না। তাছাড়া ছোটবেলা থেকে এদের মধ্যে যে তুচ্ছ অহংবোধ জেগে ওঠে তার জন্যও এরা পরবর্তীকালে মানসিক বিকৃতির শিকার হয়। যেহেতু ওর মধ্যে অপরাধবোধের অভাব রয়েছে ওকে কাউন্সেলিংয়ের জন্য মনোবিদের কাছে নিয়ে যাওয়াটাও কঠিন। ওকে ঠিক রাস্তা দেখানোর জন্য আপনাদের একটু কঠিন হতে হবে। ওর ব্ল্যাকমেলের কাছে নতিস্বীকার করা বন্ধ করুন। অন্যায় করলে ওকে এড়িয়ে চলুন। মুড ভাল থাকলে ওকে বিষয়গুলি বোঝানোর চেষ্টা করুন। এতে ওর আচরণে খানিকটা সংশোধন হতে পারে। যদি মনোবিদের কাছ থেকে কাউন্সেলিং করাতে পারেন তাহলে অনেকটাই উপকার পাবেন।

facebook
facebook