Monemone
Sananda fashion

ডিভোর্স এবং আপনার সন্তান

ডিভোর্সের যন্ত্রণা স্বামী-স্ত্রী এবং পরিজনদের কমবেশি ভোগ করতে হলেও-ডিভোর্সের আসল শিকার হন ছেলেমেয়েরা । একটি আলোচনা ।

g

আমার খুড়তুতো বোনের গতবছর ডিভোর্স হয়েছে। সম্প্রতি ও আবার বিয়ে করেছে। ওর একটি ছেলে আছে। আড়াই বছর বয়স। দাদুদিদা, মাসি ও মামার সঙ্গে থাকে। আমার বোনও ডিভোর্সের পর এখানেই থাকত। এতদিন পর্যন্ত সব ছেলেটি ঠিকই ছিল। কিন্তু ওর মা চলে যাওয়ার পর থেকেই, বুঝতে পারছে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে। কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না। কীভাবে পরিস্থিতি ওর জন্য স্বাভাবিক করব বুঝতে পারছি না। ওর মা যে আবার বিয়ে করছে এবং অন্য বাড়িতে চলে যাবে, এ সবের আঁচ আমরা ওর উপর পড়তে দিইনি। কিন্তু এখন ও সারাক্ষণ মন খারাপ করে বসে থাকে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ওর মনে হয় সবাই ওকে ছেড়ে চলে যায়। বুঝতে পারছি না, কীভাবে ওকে সাহায্য করব।
আত্রেয়ী মল্লিক, ইমেল মারফত

বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে ছাড়াছাড়ি হয়। ডিভোর্সর আইনগত দিকটা সহজ হয়ে যাওয়ার ফল আমাদের দেশেও ডিভোর্সের হার বাড়ছে হু হু করে। ভালবাসাহীন, তিক্ত দাম্পত্যকে সারাজীবন বহন করার চেয়ে বিবাহ-বিচ্ছেদের পর নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ না নেওয়ার পক্ষে সম্ভবত কেউউ আজ আর সওয়াল করবেন না। ডিভোর্সের যন্ত্রণা স্বামী-স্ত্রী এবং পরিজনদের কমবেশি ভোগ করতে হলেও-ডিভোর্সের আসল শিকার হন ছেলেমেয়েরা। শিশু অথবা কিশোর যেই হোক না কেন, বাবা-মায়ের ডিভোর্সে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় সন্তানেরাই।

জন্মের পর বেঁচে থাকার জন্য শিশুকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় তার মায়ের উপর। ছ’ থেকে আট সপ্তাহ বয়সের মধ্যে শিশুটু তার মাকে আলাদা করে চিনে নিতে পারে। মা-ই যে তার প্রধান সহায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বোধটা শিশুর মনে দৃঢ় হতে থাকে। ছ’-আট বছর বয়সে বাচ্চাদের মধ্যে বাবার প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। আস্তে আস্তে বুকের দুধ ছাড়ার সময় হলে, শিশু আর আগের মতো মায়ের সান্নিধ্য পায় না। তখন বাবার পুরুষালি আচরণ, ভারী কন্ঠস্বর শিশুকে আকষর্ণ করতে পারে। এইসময় থেকে বাবা-মাকে একসঙ্গে কাছে পেলে শিশু সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

ধরা যাক, শিশুটির যখন দু’বছরের কম বয়স, বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেল। সম্ভবত এমনটাই ঘটেছে পত্রলেখিকার বোনের সঙ্গে। ডিভোর্সের পর শিশুটিকে বাবা-মায়ের মধ্যে একজনতে হাতেতেই হয়। এর ফলে যে অসহায়তা, নিরাপত্তাহীনতা, শিশুটিকে তা বহন করতে হয়েছে জীবনের অনেকটা সময় ধরে। আপনার বোনের সন্তানটির মতো অধিকাংশ শিশুকেই বাবা-মায়ের ডিভোর্সের পর নিজের বানি ছেড়ে মায়ের সঙ্গে নতুন আশ্রয়ে চলে যেতে হয়। দাদু-দিদা-মামা-মাসীদের কাছে থাকাটা যতই আরামদায়ক হোক না কেন, বাবা এবং নিজেদের পুরনো বাড়িঘর ছেড়ে আসার যন্ত্রণা সিশুটির মধ্যে থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া বাবা কী দোষ করলল যাতে মা তাকে ছেড়ে এলো, এই ব্যাপারটা অত ছোট বয়সে বোধগম্য হয় না বলেই, শিশুটির যন্ত্রণাও বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক।

শৈশবে বাবা-মায়ের মধ্যে কোনও একজনকে হারালে, তা সে মৃত্যু বা বাবা-মায়ের ডিভোর্স যে কোনও কারণেই হোক, শিশুদের মধ্যে নিজের চেয়ে আরও ছোট শিশুদের আচরণের প্রবণতা দেখা যায়। এটা যেন তার শৈশবের বয়সে ফিরে যাওয়া, যখন সে বাবা-মা দু’জনকেই পেত। এর ফলে তার মধ্যে কান্নাকাটি, জেদ, অবাধ্যতা বাড়তে পারে। আপনার বোনের নতুন বিয়ের পর নিজের মাকে হারানোটা শিশুটির মধ্যে অসহায়তা যে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা বলা বাহুল্য। তার দাদু, দিদা, মামা, মাসীর পক্ষে সেই অসহায়তা পূরণ করতে সময় লাগবে। ভল হয়, প্লে স্কুলের পাশাপাশি দিনের মধ্যে খানিকটা সময় যদি ওকে ক্রেশে রাখা যায়। সেক্ষেত্রে অন্য শিশুদের সঙ্গে ও মেলামেশার সুযোগ পারে। এতে ওর আচরণে পরিবর্তন আসবে। আপনার বোনও যাতে নিয়মিত ওর সঙ্গে এসে দেখা করে, সেই ব্যবস্থা কিন্তু অতি অবশ্যই করতে হবে।

facebook
facebook