Monemone
Sananda fashion

বানিয়ে বানিয়ে নানারকম কথা বলা

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কোনও সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষকে অন্য কারওর সঙ্গে দশ মিনিটের বেশি কথাবার্তা বললে শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যে কথা আদানপ্রদানের সম্ভবনা দেখা দেয়। একটি বিশেষ আলোচনা।

g

আমার স্ত্রীর বয়স ৪৫। ওর একটা অদ্ভুত সমস্যা আছে। ও প্রায়ই বানিয়ে বানিয়ে নানারকম কথা বলে। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে মিথ্যে কথা বলে। আগেও এই সমস্যা ছিল। তবে অনেক কম। গত কয়েকবছর ধরে এই ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। তবে সমস্যাটা অদ্ভুত এই কারণে, ওই মিথ্যেগুলো বলার কোনও অর্থ নেই। অর্থাৎ নিজের কোনও দোষ ঢাকতে বা নিজেকে ঠিক প্রমাণ করতে যে মিথ্যে বলছে এমনটা নয়। যেমন আমাকে হয়তো বলল, আজ সকালে ওঁর বোন এসেছিল দেখা করতে। অনেকক্ষণ গল্প করেছেন ওঁরা। কিন্তু পরে হয়তো জানতে পারলাম যে ওইদিন ওঁর বোন আসেননি। আত্মীয়মহলেও এরকম নানা কথা প্রায়ই বলে থাকেন। হয়তো হঠাৎ করে কাউকে বলে বসলেন আমারা গত সপ্তাহে পুরী ঘরতে গিয়েছিলাম। এরপর আমাকে কেউ ওই নিয়ে প্রশ্ন করলে আমি খুবই সমস্যায় পড়ে যাই। কী উত্তর দেব ভেবে পাই না। আমার স্ত্রী যে খুব চাতুরী করে মিথ্যে বলেন তা নয়, স্বাভাবিকভাবেই ধরাও পড়ে যান। আমি জানি আমাদের পিছনে সবাই ওঁর এই ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করে। কিন্তু তাতে আমার স্ত্রীর কিছুই ভাবান্তর হয় না। আমি অনেকবার এই নিয়ে ওঁর সঙ্গে কথা বলেছি। প্রথমে কিছুতেই স্বীকার করতে চান না যে উনি মিথ্যে বলেছেন। তারপর মিথ্যে প্রমাণ হয়ে গেলে চুপ করে থাকেন। কোনও জবাব দেন না। আমি বারবার জি়জ্ঞেস করেও এই আচরণের কোনও সদুত্তর পাইনি। কয়েকবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছি। কিন্তু উনি রাজি হননি। আমাদের কোনও সন্তান নেই। আমি সকালে অফিসে বেরিয়ে যাই। ফিরতে রাত হয়। উনি কি একাকিত্ব থেকে এই ধরনের কাজ করছেন?

দেবাশীষ সরকার, বহ্মপুর

মিথ্যে কথা কে না বলে? মনোবিদদের মতে দুনিয়ার প্রায় সব মানুষই দিনে একটা থেকে দুটো মিথ্যে কথা বলেই থাকে। ১৮ থেকে ৭১ বছর বয়সের নানা ধরনের মানুষের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে কোনও সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষকে অন্য কারওর সঙ্গে দশ মিনিটের বেশি কথাবার্তা চালাতে হলে শতকরা ৩০ ভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যে কথা আদানপ্রদানের সম্ভবনা দেখা দেয়। কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা তাঁদের বাবা মায়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় সবচেয়ে বেশি মিথ্যে কথা বলে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও মিথ্যের আদানপ্রদান চলে যদিও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তা কমে যায়। মিথ্যে কথা বলাটা যে সবসময়ই দোষের তাও কিন্তু নয়। মায়ের বকুনি এড়াতে, স্ত্রীর টেনশন কাটাতে বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি বাড়াতে মিথ্যে বলাটাই স্বাভাবিক। অন্যকে আঘাত না দেওয়ার জন্য অথবা শান্তি বজায় রখাতেও মিথ্যে কথা বলতেই হয় আমাদের।

সমস্যা হল আপনার স্ত্রীর মতো মানুষদের নিয়ে যাঁরা অকারণে মিথ্যে কথা বলেন এবং সহজেই ধরা পড়ে যান। যেখানে মিথ্যে বলে নিজের কোনওরকম লাভ নেই কিংবা সত্যি কথাটা প্রকাশ হলে কোনওরকম ক্ষতির আশঙ্কা নেই সেখানে ক্রমাগত মিথ্যে বলে যাওয়াটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। এই সমস্যাকে পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্বের সমস্যা হিসেবেই দেখতে হবে। সাধারণত একটু অসামাজিক মনোভাবের মানুষ যাঁরা অন্যের উপর অন্যায়ভাবে জোর খাটাতে চান অথবা নিজেদের পছন্দের জিনিসটা অন্যের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেন, তাঁদের মধ্যে অকারণে মিথ্যে বলার প্রবণতা দেখা দেয়। যাঁরা নিজেদের খুব ভালবাসেনতাঁরাও নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য বানিয়ে বানিয়ে নানা রকম কথা বলেন এবং সেই মিথ্যেগুলোকে অনেকসময় নিজেরাও সত্যি বলে বিশ্বাস করেন।

আপনার স্ত্রীর আচরের যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে উনি যে উৎকণ্ঠা এবং বিপন্নতায় ভোগেন এমনটাই মনে হয়। আপনার স্ত্রী একজন মাঝবয়সি সন্তাহীনা মহিলা। আপনিও অফিসের কাজে দিনের অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। এরকম ক্ষেত্রে ওঁর নিঃসঙ্গতায় ভোগাটাই স্বাভাবিক। সন্তান না হওয়া, সংসারে যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়া অথবা খুব কাছের মানুষের সহানুভূতি না পেলে যে কোনও মহিলাই হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন। আপনি যদি আপনার স্ত্রীকে একটু বেশি সময় দেন, ওঁর অদ্ভুত আচরণের দিকে সবসময় আঙুল না তোলেন, যদি তাঁকে বাইরের কাজের জগতে একটা জায়গা করে দিতে পারেন তাহলে আশা করা যায় ওঁর অসহায়তা অনেকটাই কমবে এবং কল্পনার জগত থেকে উনি সরে আসবেন, যদি সুযোগ থাকে এবং উনি সম্মত হন, তাহলে সন্তান দত্তক নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।

facebook
facebook