Monemone
Sananda fashion

সবসময় টেনশনে ভুগি

আসল কথা আমরা সবসময় যে সব জিনিস ঘটবে ভেবে ভয়ে, টেনশনে দিন কাটাই তার প্রায় কোনওটাই আমাদের জীবনে শেষ পর্যন্ত ঘটে না। অথচ এইসব অযৌক্তিক আশঙ্কা কিছুতেই আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। একটি আলোচনা।

g

সম্প্রতি আমার বিয়ে হয়েছে। স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। তাই আমাকেও বছরের বেশিরভাগ সময় বাইরেই কাটাতে হয়। যখন বিদেশে থাকি, তখন মনের মধ্যে অদ্ভুত একটা ভয় সবসময় কাজ করে। আমরা দুই বোন। দিদি বড়। ওর আগেই বিয়ে হয়েছে। মা বাবা বাড়িতে এখন একাই থাকেন। আমার সবসময় বাবা মার জন্য চিন্তা লেগেই থাকে। ওঁরা একবার ফোন না ধরলেই প্রচণ্ড টেনশন হয়। বাবা বা মা কোথাও বেরিয়েছে জানলেন ভয় হতে থাকে। মনে হয় রাস্তায় যদি কোনও অসুবিধা হয়। যদি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করে, যদি রাস্তায় ছিনতাই হয় ইত্যাদি। বিদেশে গেলেই মনে হয়, পরের বার যখন ফিরে আসব, বাবা মা কে সুস্থ অবস্থায় দেখতে পাব তো? তাছাড়া যেহেতু দু’জনেরই বয়স হয়েছে আমার খালি মনে হয় একজন যদি না থাকেন, তখন আর একজনের কী হবে? এসব ভেবে ভীষণ টেনশন হতে থাকে। এখন তো স্বামীর জন্যও খুব চিন্তা হয়। ও রোজ গাড়ি নিয়ে অফিসে যায়। ও বেরলোই আমার মনে হয়, যদি কোনও গাড়ি ধাক্কা দেয়, যদি ওঁর কোনও ক্ষতি হয় ইত্যাদি। বর্তমান আমার এই ভয় ক্রমশ বেড়েই চলেছে। প্রত্যেকটা দিন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার টেনশনও শুরু হয়। সবাই ঠিকমতো বাড়ি ফিরলে মনে একটু শান্তি পাই। আবার রাত বাড়লে ভয় হতে থাকে যদি রাতে হঠাৎ করে কারওর কিছু হয়, তখন আমি কী করব? এতদূর থেকে আমি তো কিছুই করতে পারব না। এসব ভাবনার ফলে ঠিকমতো ঘুম আসতে চায় না। আমি জানি এগুলো হয়তো অবান্তর চিন্তা। কিন্তু কিছুতেই এর থেকে বেরতে পারিনা। আমার কী করা উচিত?
স্নেহা মজুমদার, ই-মেল মারফত

আপনি যে ক্রমশই টেনশনের রুগী হয়ে উঠছেন সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। স্ট্রেস বা মানসিক চাপের ফলে কমবেশি টেনশন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। নিজের অথবা কাছের মানুষের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগের জন্ম হয়। কোনও কিছু হারানোর আশঙ্কা থেকে উৎকণ্ঠা দেখা দিতে পারে। হারানোর মধ্যে সোনাদানা, টাকাপয়সা, জায়গাজমির মতো সম্পদ যেমন পড়ে তেমনই সম্মান, ভালবাসা, পজ়িশন ইত্যাদি হারানোর ভয়েও মানুষ টেনশনে ভোগে। পরীক্ষার আগে যে টেনশন হয় তার পিছনে থাকে পরীক্ষায় ফেল করা বা খারাপ রেজ়াল্ট করার ভয়। খারাপ রেজ়াল্ট হলে বাবা মা বন্ধুবান্ধবদের কাছে খাটো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে অস্থির হয়ে ওঠে। যাঁদের আত্মবিশ্বাস কম তাঁদের মধ্যে ভয় আর টেনশনও বেশি দেখা যায়।

আপনার জীবনে দুটো ঘটনা পরপর ঘটেছে। প্রথমে বিয়ে, বাবা মাকে ছেড়ে অন্য পরিবারে চলে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, দেশ ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে দূর বিদেশে গিয়ে থাকতে বাধ্য হওয়া। সম্ভবত বাবা মাকে ছেড়ে আপনি আগে কখনও থাকেননি এবং দিদির বিয়ের পর বাবা মায়ের অনেকটা দায়িত্ব নিতে হয়েছিল আপনাকে। আমারা যাঁদের নিজের চেয়েও বেশি ভালবাসি, যাঁদের ভাল-মন্দ সবকিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিই, তাঁরা যখন নিজের কাছে থাকেন না, তখন তাঁদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগাটাই স্বাভাবিক। এখানেও সেই হারানোর ভয়। ছেলেমেয়ে যখন বাড়ির বাইরে থাকে তাঁদের নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা অথবা স্বামী যখন সময়মতো বাড়ি ফেরেন না তখন স্ত্রীর মধ্যে যে অস্থিরতা বা অস্বস্তি দেখা দেয় তা এই কারণেই।

আপনার ভয় আশঙ্কার বিষয়গুলি নিয়ে এবার একটু পর্যালোচনা করা যাক। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে তাঁর কাজের জায়গায় চলে আসাতে নিশ্চয়ই আপনার বাবা মায়ের সম্মতিতেই হয়েছে। কোনও বাবা মাই চান না তাঁদের বিবাহিত মেয়ে নিজের সংসার জীবনকে অবহেলা করে তাঁদের কাছেই পড়ে থাক। তাঁদের দেখভাল করার জন্য আপনি যদি দেশে ফিরে আসেন, তবে আপনার স্বামীকে একা থাকতে হবে। এখন স্বামী অফিস থেকে যতক্ষণ না বাড়িতে ফেরেন ততক্ষণ আপনি দুশ্চিন্তায় থাকেন। সেই মানুষটাকে এতদূরে ফেলে রেখে দেশে ফিরে আসলে আপনি যে নিদারুণ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু আপনার সদ্য বিয়ে হয়েছে, আপনার বাবা মায়ের খুব বেশি বয়স হয়েছে বলে মনে হয় না। আপনার অনুপস্থিতিতে তাঁদের যদি কোনও বিপদআপদ হয়, তাহলে তাঁরা নিজেরাই হয়তো সামলে নিতে পারবেন। না হসে আপনার দিদি তো আছেন। নিশ্চয়ই ঘনিষ্ট কিছু আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুও রয়েছেন। হঠাৎ করে তাঁদের শরীর খারাপ হলে বা তাঁরা কোনও বিপর্যয়ের শিকার হলে অন্যেরা কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন না, এই ভাবনাটাও কিন্তু অমূলক। আসল কথা আমরা সবসময় যে সব জিনিস ঘটবে ভেবে ভয়ে, টেনশনে দিন কাটাই তার প্রায় কোনওটাই আমাদের জীবনে শেষ পর্যন্ত ঘটে না। অথচ এইসব অযৌক্তিক আশঙ্কা কিছুতেই আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না।

টেনশন থেকে বেরতে আপনার বেশি করে কাজের মধ্যে যুক্ত হওয়া দরকার। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে আড্ডা মেলামেশায় সময় কাটান। শরীর এবং মন ভাল রাখতে যোগব্যায়াম করুন। অন্য দেশে যদি কোনও কাজে যুক্ত হতে সমস্যা থাকে তাহলে নিজের মতো করে নতুন কোনও বিষয়ে পড়াশওনা শুরু করতে পারেন।

facebook
facebook