Swastha
x

প্রিম্যাচিওর বেবি

প্রিম্যাচিওর বাচ্চা হলে অনেক দম্পতিরা ভেঙে পড়েন। আগেকার দিনে অনেক সময়ই এক্ষেত্রে বাচ্চাকে বাঁচানো সম্ভব হত না। তবে এখন উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতির সাহায্যে তাদের সুস্থ, স্বাভাবিক জীবন দেওয়াও সম্ভব। প্রিম্যাচিওর বেবির কেয়ার নিয়ে আলোচনায় ডা. তপোব্রত চট্টোপাধ্যায়।

g

গোটা বিশ্ব জুড়েই বাড়ছে প্রিম্যাচিওর শিশুর সংখ্যা। বর্তমানে সারা পৃথিবীর মধ্যে আমাদের দেশেই সবচেয়ে বেশি প্রি-টার্ম বেবি বা প্রিম্যাচিওর বেবির জন্ম হয়। এই ধরনের শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে, এমনকী কিছু সমস্যা সারাজীবনও রয়ে যেতে পারে। আগেকার দিনে, আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে নব্বইয়ের দশকের শেষভাগের আগে পর্যন্ত ১ কেজি ওজন বা প্রেগনেন্সির ৩০তম সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে অনেককেই বাঁচানো সম্ভব হত না।
তবে এখন ছবিটা অনেক বদলে গিয়েছে। ইদানীং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উন্নত চিকিৎসা পরিষেবার সাহায্যে সময়ের আগে জন্মানো শিশুদের সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে চিকিৎসকদের মূল লক্ষ্য শুধু প্রিম্যাচিওর বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখা নয়, তাকে যথাসম্ভব রোগমুক্ত একটি স্বাভাবিক জীবন উপহার দেওয়া। এ বিষয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণার প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশে অনেক সময় অর্থনৈতিক কারণে তা ফলপ্রসূ হয় না।
গর্ভকালের ৩৭তম সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের প্রিম্যাচিওর বেবি বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের আগে শিশুর জন্মানোর সঠিক কারণ এখনও অজানা। তবে সন্তানসম্ভবা মায়ের অতিরিক্ত ওজন, রক্তাল্পতা, ধূমপান করার অভ্যাস, ডায়াবিটিস, হাইপারটেনশন বা অপুষ্টি প্রিম্যাচিওর শিশু জন্মের সম্ভাব্য কিছু কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যে শিশুর যত আগে জন্ম হয়, তার শারীরিক সমস্যা থাকার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

সমস্যা

প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের জন্মের সময় নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। এগুলোকে বলা হয় শর্ট টার্ম এফেক্ট। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার শাস-প্রশ্বাসের সমস্যা থাকতে পারে, রক্তচাপ কম থাকতে পারে, হার্টরেট অস্বাভাবিক থাকতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে গিয়ে হাইপোথারমিয়া হতে পারে বা নিউরোলজিকাল সমস্যা থাকতে পারে। এ ছাড়া এই ধরনের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে বলে এরা সহজেই সংক্রমণের শিকার হতে পারে।
তবে অনেক ক্ষেত্রে শিশু বড় হয়ে যাওয়ার পরেও কিছু দীর্ঘকালীন সমস্যা বা লং টার্ম এফেক্ট দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে থাকে চোখের সমস্যা, কানে শুনতে অসুবিধে হওয়া বা দাঁতের সমস্যা। প্রিম্যাচিওর বেবিদের অনেক সময় দাঁত উঠতে দেরি হয় বা অ্যালাইনমেন্টে গণ্ডগোল থাকে। এ ছাড়া উপযুক্ত কগনিটিভ ফাংশন না হওয়া বা নিউরোলজিকাল সমস্যা থেকে গেলে তা থেকে সেরিব্রাল পলসি পর্যন্ত হতে পারে।

সমাধান

প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে ব্রিদিং সাপোর্ট হিসেবে নেজ়াল ভেন্টিলেশন বা নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেশন দেওয়া হয়। সব সময় মনে রাখতে হবে, প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের মায়ের সংস্পর্শে রেখে, বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করলে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যায়। বাচ্চার মধ্যে নিউরোডিসেবিলিটি থাকলে তার মোকাবিলা করার জন্য আর্লি ইন্টারভেনশন বা ফিজ়িওথেরাপি করতে হতে পারে। অনেক সময় বাচ্চার নিউরোডেভেলমেন্টে সাহায্য করার জন্য মিউজ়িক থেরাপিরও সাহায্য নেওয়া হয়।
প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিউট্রিশনের অত্যন্ত প্রয়োজন। এই ধরনের বাচ্চাদের মাতৃদুগ্ধ দিতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়। অনেক সময় তাই দুধ ফ্রিজ় করে তারপর সেটা গরম করে বাচ্চাকে খাওয়ানো হয়। মাঝে মাঝে বাচ্চা ভেন্টিলেশনে থাকলেও ব্রেস্টফিডিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। ডাক্তারি পরিভাষায় এই পদ্ধতিকে বলা হয় ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার। ক্যাঙ্গারু যেভাবে পেটের থলেতে বাচ্চাকে আগলে রেখে প্রাণ বাঁচায়, তেমনি ক্যাঙ্গারুর মতো অপরিণত বয়সের কম ওজনের নবজাতককে মা তাঁর বুকে আগলে রেখে সুস্থ করে তুলতে পারেন। এই পদ্ধতিতে শিশুকে ইনকিউবেটরে রাখার প্রয়োজন হয় না। প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। তবে মা শিশুকে বুকে জড়িয়ে রাখলে মায়ের শরীরের তাপমাত্রা বাচ্চার শরীরে প্রবাহিত হয়। এই পদ্ধতি বাচ্চার পুষ্টির পাশাপাশি তার নিউরোডেভেলপমেন্ট, শ্বাস-প্রশ্বাস, হার্ট রেট ও মায়ের সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করতেও সহায়তা করে। এতে কোনও সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনাও কম থাকে। এ ছাড়া এখন মিল্ক ব্যাঙ্কের পরিষেবাও পাওয়া যায়।

বাচ্চার মধ্যে এপিলেপ্সির সমস্যা তৈরি হলে সেই অনুযায়ী ওষুধপত্র দেওয়া হয়। এইসব ওষুধের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। প্রিম্যাচিওর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অন্যতম লং টার্ম এফেক্ট হচ্ছে ভিশুয়াল প্রবলেম। এই সমস্যার সমাধানে লেজ়ার থেরাপি করা হয় এবং পরবর্তীকালে চশমাও পরতে হতে পারে। কানে শুনতে অসুবিধে হলে ককলিয়ার ইমপ্লান্ট করাতে হতে পারে। এ ছাড়া হিয়ারিং এড তো আছেই। তবে বাবা-মায়ের মনে রাখা উচিত, প্রিম্যাচিওর বেবিকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরেও ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিয়মিত ফলো-আপ করতে হবে। না হলে কিন্তু বাচ্চার মধ্যে স্থায়ী কোনও শারীরিক সমস্যা রয়ে যেতে পারে। এখনকার দিনে কোনও কোনও বাচ্চার স্পেশাল হেল্পের প্রয়োজন হলেও, বেশির ভাগ প্রিম্যাচিওর বাচ্চাই পরবর্তীকালে সাধারণ স্কুলে যেতে পারে। তাই ওরা কোনও অংশে কম বা অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। অধিকাংশ প্রিম্যাচিওর বাচ্চাই এখন বড় হয়ে আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করে।

facebook
facebook