Swastha
x

ফুসফুসের ক্যানসার

শুনতে ভয়াবহ মনে হলেও আধুনিক চিকিত্‌সায় লাং ক্যানসারকেও হারিয়ে দেওয়া সম্ভব। আর সঙ্গে অবশ্যই প্রয়োজন সতর্কতা। জানাচ্ছেন ডা. সুস্মিতা রায়চৌধুরী।
- – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - – - -
ঘন ঘন কাশি হলে অনেকেই অবহেলা করেন। ‘ও তো সর্দিকাশির লক্ষণ’…বলে গুরুত্ব দেন না মোটেও। শেষে আরও নানা সমস্যা মিলে যখন ব্যাপারটা জটিল হয়, তখন জানা যায় যে তিনি হয়তো ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত! ক্যানসার শব্দটা শুনলেই মনোবল হারিয়ে ফেলার কোনও কারণ নেই। বরং, চিকিত্‌সা করে সুস্থ থাকতে পারেন আপনিও।

সমস্যার গভীরে
লাং ক্যানসারের অন্যতম বড় দু’টি কারণ হল: পরিবেশ দূষণ ও ধূমপান। গবেষণা অনুযায়ী এই মুহূর্তে আমাদের দেশের ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে ১৩.৪ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। পূর্ব ভারতে ক্যানসার আক্রান্তদের সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় ২১.২ শতাংশ। আর দেশে বিদেশে মোট ক্যানসার রোগীর ৯০ শতাংশই ধূমপান করেন। যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের লাং ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা নন স্মোকারদের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। আসলে, সিগারেটে প্রায় চার হাজার ধরনের কেমিক্যালস থাকে। এই কেমিক্যালগুলো ফুসফুসের ক্যানসার ছাড়াও বিভিন্ন ক্যানসার ডেকে আনতে পারে। বিশেষত যে সব ধূমপায়ীদের ভিটামিন ডি-এর অভাব থাকে, তাঁদের ক্যানসারের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কয়েক বছর আগেও লাং ক্যানসারে আক্রান্তদের গড় বয়স ছিল ৬০ বছর বা তার বেশি। তবে আজকাল তুলনায় অনেক কম বয়সীদেরও লাং ক্যানসার হচ্ছে। তবে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়াও আরও কিছু কিছু কারণের ফলে ফুসফুসে ক্যানসার হতে পারে। ডিজ়েলের ধোঁয়া, কয়লা, পিচ বা আলকাতরার ধোঁয়া, আর্সেনিক, অ্যালুমিনিয়াম, রং ইত্যাদির বিষাক্ত রাসায়নিক প্রভাবের পাশাপাশি গামা রেডিয়েশনের কারণেও কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলেই হয় ক্যানসার। তবে, লাং ক্যানসারের প্রধান কারণ কিন্তু ধূমপানই। তাই, ধূমপান অবিলম্বে ছাড়তে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লাং ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনও উপসর্গ থাকে না। তবে, অ্যাডভান্সড স্টেজে বাড়াবাড়ি রকমের লক্ষণ দেখা যায়। লাং ক্যানসারের অন্যতম লক্ষণ লাগাতার কাশি। তবে কাশির সঙ্গে আরও কিছু উপসর্গ থাকে। জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, বুকে ব্যথা, নিঃশ্বাসের কষ্ট, কাশির সঙ্গে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদির মতো উপসর্গও হতে পারে। একইসঙ্গে হাড়ে ব্যথা, কাজে অনীহা, বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ, খেতে কষ্টবোধ ইত্যাদি আরও অনেক লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে আপনি হয়তো লাং ক্যানসারে আক্রান্ত। এগুলো অবশ্য অন্যান্য অসুখেরও লক্ষণ হতে পারে। তবে কাশি হচ্ছে বলে বাজারচলতি কাশির ওষুধ খেয়ে অবহেলা করবেন না। ফুসফুসের ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে চিকিত্‌সা করে কিছুটা ভাল থাকা যায়। তবে আমাদের দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতা এত কম যে, প্রায় ৮০ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে স্টেজ ফোর-এ পৌঁছে। আর তখন চিকিত্‌সকদের বিশেষ কিছুই করার থাকে না।

চেস্ট এক্স রে, স্পুটাম সাইটোলজি, সি.টি স্ক্যান, এমআরআই, ব্রঙ্কোস্কোপি ও সি.টি গাইডেড বায়োপসি করাতে হতে পারে। অনেক সময়ে ফুসফুসে কোনও টিউমারের অস্তিত্ব জানা গেলে টিউমারের স্যাম্পল নিয়ে হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করানো হতে পারে। ইদানীং নতুন ধরনের টেস্ট EBUS ও পেটস্ক্যানের সাহায্যে রোগ নির্ণয় করা আরও সহজ হয়েছে। একইসঙ্গে রুটিন ব্লাড টেস্টও করার প্রয়োজন হয়। রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হলে ক্যানসার কোন পর্যায়ে আছে সেটি জানতে আরও কয়েকটি পরীক্ষা করা দরকার। ক্যানসারযুক্ত টিউমারটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকলে সার্জারির সাহায্যে তা বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু রোগ ছড়িয়ে পড়লে একাধিক চিকিত্‌সা পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন। ফলাফল যে সবসময় খুব ভাল হয়, তা কিন্তু নয়।

চিকিত্‌সা ও প্রতিরোধ

ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ার পরে ৩২ শতাংশ রোগী এক বছর বেঁচে থাকেন। ১০ শতাংশ রোগী পাঁচ বছর ও পাঁচ শতাংশ রোগী ১০ বছর বেঁচে থাকতে পারেন। তবে, অবশ্যই সঠিক সময়ে চিকিত্‌সা প্রয়োজন। প্রাথমিক অবস্থায় এই অসুখের চিকিত্‌সা হিসেবে ফুসফুসের আক্রান্ত অংশটি সার্জারির সাহায্যে বাদ দেওয়া হয়, একে বলে লোবেক্টমি। এরপর কেমোথেরাপি ও প্রয়োজনে রেডিওথেরাপির সাহায্য নেওয়া হয়। ইদানীং ফুসফুসের ক্যানসার আক্রান্ত অংশটিকে সার্জারির সাহায্যে বাদ দিয়ে স্টিরিওট্যাক্টিক অ্যাবলেশন রেডিওথেরাপির সাহায্যে প্রাথমিক পর্যায়ে তো বটেই, ক্যানসারের অ্যাডভান্সড স্টেজেও ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে।

লাং ক্যানসারের সম্ভাবনা কমাতে ধূমপান একেবারে বারণ। সঙ্গে প্যাসিভ স্মোকিংয়ের ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হবে। গাড়ির ধোঁয়া, কয়লা বা কাঠের ধোঁয়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। যাঁদের হাঁপানি বা ফুসফুসের অন্য অসুখ আছে, তাদেরও নিয়মিত চিকিত্‌কের তত্ত্বাবধানে থেকে নির্দিষ্ট ডোজ়ের ওষুধ ব্যবহার করা প্রয়োজন। আর মোটের উপর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন খুব জরুরি। তাজা ফল খান। অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট ও ভিটামিন এ-যুক্ত খাবার খাওয়া খুব ভাল। গাজর, পেঁপে খান। বাড়িতে যাতে হাওয়াবাতাস চলাচল করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখুন। যাঁদের একবার অপারেশন হয়ে গিয়েছে তাঁরা নিয়মিত ডাক্তারের চেক-আপে থাকবেন। ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাক্সিনেশন নিয়ে রাখবেন।

facebook
facebook