Travel
Sananda fashion

করবেটের জঙ্গলে

পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে আছে ল্যান্টেনার ঘন ঝোপ। তাতে গোলাপি ও আগুনরঙা ফুল ফুটে আছে। কুলকুল করে ঝর্ণার শব্দ, পাহাড়ি পাথরের গন্ধ আর গভীর জঙ্গলের গাঢ় সবুজ অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে বারবার। কানে পৌঁছল সম্বর হরিণের সতর্কবার্তা। কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসুন করবেটের জঙ্গলে।

g

হিমালয়ের কোলে গভীর এক জঙ্গলের ঘনানধকার ক্রমেই শিথিল হয়ে আসছে। আকাশে একটু করে আলো ফুটছে। ওপাশের পাহাড়টার গায়ে ঘন ঝোপের আড়াল থেকে সম্বর হরিণটা ডেকে উঠল একবার, দুইবার, তিনবার। কঁক, কঁক, কঁক। সমগর জঙ্গলে তার সতর্কবার্তা ছনিয়ে পড়তেই আমাদের জিপসির চালক দানিশ গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে দলল। রোড পে হি মিল জায়েগি ও’। ওইকানে পৌঁছতে হবে ঝট করে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ঘুরপাক খেতে খেতে যখন ওই পাহাড়ের গায়ে পৌঁছলাম, তখন আকাশ একেবারে পরিষ্কার।

সম্বর হরিণটা তখনও ডেকে চলেছে। গাড়িটা পাহাড়ের একবারে গা ঘেঁষে দাঁড় করাল দানিশ। নিস্তব্ধ জঙ্গলে সম্বরের ডাক ছাড়া একটা পাতা পড়ার শব্দও নেই। ওই ঘন ঝোপটা নড়ে উঠল একটু। কি আছে ওখানে? ওই ঘন ঝোপের আড়ালে? সম্বরটা চুপ। দানিশ গাড়িটা স্টার্ট করবে করবে ভাবছে, এমন সময় ওই পাশের ঝোপের পাতাগুলো কেঁপে উঠল খরখর করে। চোখের পলক পড়ল না নিমেষেই ঘটে গেল ঘটনাটা। গাঢ় সবুজ পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এক বিরাটাকায় বাঘ। ভয়ানক দুটো কটাক্ষ দৃষ্টি মেলে ধরল আমাদের দিকে। দানিশ ফিসপিস করে বলল, “ওটা বাঘ নয় বাঘিনী, জিম করবেট টাইগার রিজ়ার্ভের বিজরানি জোনের ম্যাসিভ টাইগ্রেস শর্মিলী।” বাপরে, ওর কঠিন আগুনের মত জ্বলজ্বল করচে।

জিপসির ওপর ঠায় বসে আছি আমরা। নট নড়ন চড়ন। বাঘিনীর দৃষ্টি কিছু বলতে চাইল। দানিশ ওর চোখের ভাষা বুঝতে পেরে গাড়িটাকে পিছিয়ে নিয়ে রাখল। আমরা কিছুটা পিছিয়ে আসায় বাঘিনী যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। পথের মাঝখানটা ধরে রাজকীয় চালে আমাদের গাড়ির দিকেই এগিয়ে এল। বাঘিনী যত এগোয় আমরা তত পিছোই। যত এগোয়, তত পেছোই। এগোন পেছোনর খেলা চলল অনেকক্ষণ। অবশেষে ওই বাঁদিকের ঝোপটাতে অগৃশ্য হয়ে গেল সে।

জিম করবেট টাইগার রিজ়ার্ভের পাঁচটা জোনের মধ্যে এই বিজরানি জোনটাই রামনগর শহরের সবচেয়ে কাছে। আমাদের জিপসিটা রামনগরের করবেট মোটেল থেকে বের হয়েছিল ভোর সাড়ে পাঁচটায়। পেছনে বোঝাই করা লাগেজ আর আমাদের নিয়ে চলল জিপসি। শহুরে রাস্তার ২ কিলোমিটার পার করে বড় রাস্তার একেবারে ধারেই পৌঁছলাম আমদান্দা গেটে। বিজরানি জোনের সিংহদুয়ার এটা। বড় রাস্তা থেকে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার দূরে নৈনিতাল। এক একটা গাড়ি সাঁ সাঁ করে ওদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। মেন রোডের ধারে ফলকে বড় বড় করে লেখা ‘elephant corridor go slow’।

সেই থেকে কুমায়ুন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গরমকালের এক সকালে বেরিয়ে পড়েছি গরমকে এড়ানোর দায়ে। কিংবা একমুঠো বিশুদ্ধ নর্মল বাতাসের খোঁজে এমন হন্যে হওয়া। বনজপ্রাণীরা যেখানে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ায়, এমন নিরিবিলি নিশ্চিত ঠিকানায়। গরমকালের সকালটা ঠাণ্ডা এখানে। আরামদায়ক বলা চলে।

এই কুমায়ুনের মানুষ খেকো বাঘকে মেরেছিলেন জিম করবেট। যে বাঁঘটা নাকি দিনের পর দিন মানুষগুলোর জীবন একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ওদেরই নিষ্কৃতি দিয়েছিলেন জিম।

বেলা বেড়ে চলল। আস্তে আস্তে ঠান্ডা ভাবটা কমল। তবু মনে হল প্যাঁচপ্যাঁচে গরমে শহরের যানজট থেকে এই পাহাড়ের কোলে এসে এই শীতল ঠায়টুকু পেয়ে যেন মুক্তি পেলাম। বিজরানি জোনের এই পাহাড়ি রাস্তাটা যেন একটু বেশি রকমের এবড়ো খেবড়ো আর ধুলোয় মাখা। আমরা ধূলো উড়িয়ে একবার চনাইতে উঠছি আর উতরাইয়ে নেমে যাচ্ছি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে দাঁড়িয়ে আছে ল্যান্টেনার ঘন ঝোপ। তাতে গোলাপি ও আগুনরঙা ফুল ফুটে আছে। দুইপাশে শাল সেগুনের সারি। কোন কোন জায়গায় জঙ্গল এতটাই ঘন যে বাইরে থেকে আলো হাওয়া প্রবেশের ফাঁকটুকুও নেই। অন্ধকারে নিঝুম হয়ে আছে ওই একপালি পছটা। আর দু’পাশ দিয়ে বড় বড় গাছ যেন চেপে ধরেছে। কুলকুল করে ধর্ণার শব্দ, পাহাড়ি পাথরের গন্ধ আর গভীর জঙ্গলের গাঢ় সবুজ অন্যমন্সক করে দিচ্ছে বারবার। বার্কিং ডিয়ারটা জঙ্গলের কোন গহীন থেকে বেরিয়ে এল কে জানে? আমাদের দেখতে পেয়েই কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ডাক পেড়ে পালিয়ে গেল দঙ্গলের মধ্যে। শর্মিলি এখন কোথায় গেল? শিকার খুঁজতে? নাকি রিতা পাণি নালা ধরে সোজা জর পাহাড়ের দিকে হাঁটা দিয়েছে সে? দানিশও বোধহয় ওই একই কথা ভাবছিল।

কেননা জঙ্গলের ভাষায় বলতে গেলে শর্মিলির মুভমেন্টটা সাধারণত এ পথেই থাকে। আমরা রিতা পাণিতে এসে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। যেদিকে চোখ যায় শুধু নানা আকৃতির পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মাঝের একটা জায়দায় অল্প জলই শুধু রয়ে গেছে।

বিজরানির পাহাড় ঘুরে বেলা শেষে আমরা বনবাংলোতে পৌঁছলাম। খোলা মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছে বিজরানির বনবাংলো। ১৯২৮ সালে ইংরেজ আমলে তৈরি হয়েছে। গরমের দুপুরে বেশ আরামদায়ক এই ঘরগুলো। মোটা দেওয়ালের ভেতরে শীতল এক ঠিকানা যেন। বড় বড় বাথরুম। আমরা একটু বিশ্রাম করে পরবর্তী অ্যাডভেঞ্চারের জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। খাওয়ার ঘরটা থেকে গন্ধ আসছে ভুরভুর করে। তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম সেখানে। থালিতে সাজান রয়েছে ডাল ভাত রুটি সব্জি। মনে হল জঙ্গলে কাঠকয়লার আগুনে তৈরি এই খাবারের স্বাদই যেন আলাদা। কব্জি ডুবিয়ে খেলাম।

আবার রামনগর শহর দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। ডানদিকে কোশী নদী বয়ে চলেছে নিজের গতিপথ ধরে। জিপসিতে মাঝে মাঝে হাওয়া এসে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে। ধানগারি গেটে পৌঁছলাম বিকেল হওয়ার আগেই। অনুমতি পত্র দেখিয়ে আবার চলার শুরু। বিকেলের আলোয় জঙ্গলের সবুজের সবুজত্ব কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। তার মাঝখান দিয়েই ঘুরে ঘুরে পথ উঠেছে এপরের দিকে। ধিকালা জোনের একেবারে শুরুতেই পাহাড়ি জঙ্গলের এই অংশটাকে বলে সুলতান। সুলতানে একখানি বনবাংলো একাকি দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে শান্তিপ্রিয় লোকেরা নাকি একাকি সময় কাটাতে যান।

লম্বা লম্বা শালগাছের ছায়ায় ছায়ায় আমরা পৌঁছে গেলাম দিকালা বন বাংলোতে। এই জায়গা ধিকালা নামে পরিচিত। ওঃ বাবা, এ যো দেখছি বাঁদরের উত্পাত। দানিশ জিপসি স্ট্যান্ডে জিপসি দাঁড় করাতেই লাল মুখওয়ালা বাঁদরগুলো যেন গাড়ির উপর হামলে পড়ল। মালপত্র লটবহর যা কিছু সব ওরা খুঁটিয়ে দেখবে। বন বাংলো কর্তৃপক্ষ এসে মালপত্র নিয়ে গেল তাড়াতাড়ি।

রামগঙ্গা নদীর ধারে দোতলা বাংলোখানার আরাম কেদারাটা এখনও ঠিক ওভাবেই রাখা আছে। ঘরের সামনে বারান্দাতেই অনেকক্ষণ সময় কাটাতেন জিম করবেট। ইংরেজ আদলে ১৯২৮-এ তৈরি হয়েছে এই বাংলো। এখানে বসে তিনি লিখতেন। বেশ কিছুদিন সময় তিনি কাটিয়েছেন এখানে।

ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজতে না বাজতেই বেরিয়ে পড়েছি আমরা। প’নে ছ’টা থেকে সাফারি। প্রথমে পাখি ডাকল। আকাশে আলো ফুটল। গরমের সকালেও কেমন আমরা শীতে জবুথবু। হালকা আলোয় দেখতে পেলাম আমরা চলেছি বড় বড় সোনালি ঘাসের মধ্যে দিয়ে। একটা ছোট্ট কচ্ছপ গুটি গুটি পায়ে রাস্তা পাড় করে ঘাসের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছিল আমাদের গাড়ির শব্দে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাত্। নিজেকে খোলসের মধ্যে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিল ভয়ে।

দূরে পাহাড়ের বলিরেখে এখনও ঝাপসা লাগছে। গাঢ় সবুজ এক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে চলল দানিশ। বলল, কামারপাট্টা রোডটা এসে এই ঠান্ডি সড়কেই মিশেছে। এখানে এলে সবসময়েই শীত লাগে, তাইতো ঠান্ডিস ড়ক। সত্যি তো জঙ্গল এখানে এতটাই গভীর যে আলো হাওয়ার নাম গন্ধটি নেই। একটা ন্যাড়া গাছের ওপর থেকে এক জোড়া পলাশ ফিশ ঈগল ডেকে উঠল চ্যাঁ চ্যাঁ করে। চারপাশটা পরিষ্কার হয়ে গেছে এতক্ষণে। সম্বর হরিণটা এই ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজেও বসে আছে জলের ওপর। অবশেষে রামগঙ্গা নদীর ধারে এলাম। বিস্তীর্ণ এক প্রান্তর। অপূর্ব। ওপাশে জলের ধারে পাথরের ওপর বসে রয়েছে কতগুলো কালো কুচকুচে ধনিয়াল। ওদের মধ্যে একজন আবার ছপ করে লাপিয়ে পড়ল জলের মধ্যে।

দূরে পাহাড়ের ধূসর বলিরেখা, নীচে সোনালি ঘাসে ভরপুর মাটি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নীল জলের রামগঙ্গা নদী। আলো পড়ে চিকচিক করছে স্বচ্ছ জলরাশি। এটাই তো ধিকালা গ্রাসল্যান্ড? দেশ বিদেশ থেকে নাকি লোক আসে এই ধিকালা গ্রাসল্যান্ড দেখতে। জলের ধারে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে একদল চিতল হরিণ। পটাপট ছবি উঠছে ওদের। আমরা মাধখান দিয়ে ধীরে ধীরে চললাম। দু’পাশে সোনালি ঘাস হাওয়ায় দুলে দুলে উঠছে। ঠিক যেন বিদেশিনীর ব্লন্ড চুল হাওয়ায় উনু উড়ু।

আমরা এক জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। প্লাস্কে চা ঠিল। সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নিলাম। কিছু সময় যেতে না যেতেই দেখি দীরে ও কি দেখা যায়? কালো রহের বড় পাথরের মত কি যেন নড়ছে? দানিশ জিপসিটা এগিয়ে নিল ওদিকে। তারপর বলল, ওঃ ওতো বড় পাথর নয়, ওটা টাসকার হাতি। আমাদের থেকে খানিক তফাতেই টাসকার হাতিটা। ওর সাদা দাঁতদুটো ধারাল। ধীরে ধীরে গ্রাসল্যান্ডের দিকে এগিয়ে আসছে আর ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পড়ছে। আমাদের দেখে ঝুলধুল করে তাকাল একবার। কিন্তু এখন তো সে জলখাবার খেতে ব্যস্ত। আমাদের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে মনের সুখে জলযোগে মনোনিবেশ করলেন তিনি। গজরাজকে দেখে সময় কাটল অনেকক্ষণ।

বেলা বাড়ছে। এবার কোলা জায়গায় একটু একটু গরম বোধ হচ্ছেয় জানি আবার জঙ্গলের গহীনে ঢুকলেই শীতলতা ছনিয়ে যাবে এদিক ওদিক। গ্রাসল্যান্ডের জলের ধার ঘেঁষে আমরা চললাম আবার। খোলা আকাশের নীচে ফুরপুরে হাওয়ায় জলটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। দানিশ হঠাত্ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, ওই দেখো। আমরা চাইলাম। কী? কী দেখতে বলছে ও? জলের মধ্যে। হ্যাঁ, বাদামী রঙের। অর্টার? ভোঁদরর ওটা। কটমট করে আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। দানিস এগোল। কাছে গিয়ে দেখি ভোঁদরটা জল থেকে মাছ ধরে দুপুরের আহারে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে মাথা উটিয়ে আশপাশটা দেখে নিচ্ছে। কিচুক্ষণ সময় কাটানোর পর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঘড়ির কাঁটা এগারটা বাজার পথে। এবার ফিরতে হবে।

ধিকালা বনবাংলোর সামনে বড় ঘাসের লনে অস্ট্রেলিয়ন কিছু কঁচি কাঁচা রাগবি খেলতে বযসত। তার থেকে একটু দূরে আমেরিকান ট্যুরিস্টরা ছোট ছোট ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। এখানে ফরেন ট্যুরিস্ট খুব বেশী আসে বুঝলাম। আমাদের ঘরটা রিসেপশনের একেবারে ওপরেই নিউ এফ.আর.এইচে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে পৌছে গেলাম। বড় বড় কাঁচের জানলা পাড় করে ফুটে আছে সুদৃশ্য।

খাওয়ার ঘরটা রামগঙ্গা নদীর তীরেই। এখানেও সেই জানলার আরশি দিয়ে দেখা। রামগঙ্গা নদীর বয়ে চলা ঠিক ঐ ধূসর পাহাড়টার নীচে। দেখে মনে হচ্ছে কোন এক চিতরশিল্পির আঁকা ফ্রেমে বাঁধানো মন্তরমুগধকর চিতর। নীল, ধূসর আর সবুজের খেলা।

বাফেতে সাজানো আছে ন্যুডল, রাইস, পনির বাটার মশলা, ডাল, রাজমা, স্যালাড। ধিকালা এই বাফে টেবিলের ব্যাপারে করবেটের অন্য জায়গাগুলোর তুলনায় একেবারে আলাদা। কুমায়ুন বিকাশ মন্ডলম নিগম কতৃপক্ষের ফরেন ট্যুরিস্টের কথাটা মাথায় রেখে মেনু বানিয়েছেন।

গ্যারলের জন্য বেড়িয়ে পড়লাম দুপুর দেড়টার মধ্যেই। ধিকালার সম্বর রোডে সবেমাত্র ঢুকেছি। হঠাত্ শুনি ময়ুরের ক্কেয়া ক্কেয়া বিদঘুটে ডাক। দানিশ বলল ওটা তো আ্যালার্ম কল। রাস্তার পাশে দাঁড়ালাম চুপটি করে। সময় কাটল বেশ কিছুটা। ঝপ ঝপ করে কিসের শব্দ? দেখি ফরফর করে ঐ সামনের ঝোপটা থেকে ময়ুরটা উড়ে গেল তীরের গতিতে। মূহূর্ত গেলনা ঐ বাঁদিকের ঝোপটা থেকে দ্রুত বেড়িয়ে এল বাঘটা। বাঘটার ক্ষিপ্র দৃষ্টি দেখে ভয় পেলাম। ওর নাম পাড় ওয়ালি টাইগ্রেস।

আমরা টু শব্দটি করছিনা। এক পা দু’পা করে এগোতে এগোতে রামগঙ্গা নদীর জলে নেমে পড়ল বাঘিনী। ক্যামেরা বন্দী করা হল ওকে। চ্যাম্পিয়নের মত সাঁতরে সাঁতরে চলে গেল ওপাড়ে। গ্যারলে পৌঁছাতে এরপর দেরি হয়ে যাবে। তাই রওনা হলাম।

ধিকালার ছায়া ঘেরা মেইন রোডটা থেকে গাড়ি বাঁদিকে বাঁক নিল। ঘন শালের বন। যতই ওপরে উঠছি কেমন যেন নিরিবিলি জঙ্গলের সম্মুখীন হচ্ছি। বড় বড় গাছের আড়াল থেকে একটু আধটু দিনের আলো দেখা যাচ্ছে। নির্জন এই জঙ্গলে দেখা হল সম্বর ডিয়ারের সঙ্গে। বন শুয়োরের সঙ্গে। বন শুয়োরটা ওর ভারি শরীরটা নিয়ে পথের ওপর ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ির শব্দে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেল।

রামগঙ্গা নদী এই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে। তারই একাংশ দেখতে আমরা নামলাম ক্রোকোডাইল পুলে। গ্যারলের এই জায়গাটাতে নামার অনুমতি আছে। এই ভিই পয়েন্টে থেকে দেখা যায় নীচে বয়ে চলা স্রোতঃস্বিনীকে। কী শব্দ! পাহাড়ি নদীর ক্ষেপে ক্ষেপে বয়ে চলার শব্দ। কিছুক্ষন দাঁড়ালাম। যদি কুমির কিংবা ঘড়িয়াল দেখা যায়? ওপর থেকে নাকি বাঘমামাকেও নদী পার হতে অনেকেই দেখেছে।

পাহাড়ে পাহাড়ে ঘেরা গ্যারল বন বাংলোটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে। বিকেলের আলো পড়লে ঘন অন্ধকারে ঢেকে যায় আশপাশটা। বাংলোয় ইলেক্ট্রিসিটি নেই। সোলার সিস্টেমে জ্বালানো হয় আলো। ঘরে ঘরে একটা করে গোল সোলার বাতি দেওয়া হয়। এইটুকু আলোকেই আঁকড়ে ধরে বারান্দা আর ঘাসের মাঠ পেরিয়ে গুঁটি গুঁটি পায়ে গেলাম ক্যান্টিনের মালিকের সাথে গল্প জমে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন এখন গরমকাল। যেকোন সময় হাতির দল এসে পথ আটকে দাঁড়াতে পারে। গ্যারলে হাতিই বেশী। তবে বাংলোর আশেপাশে বাঘও ঘুরে বেড়ায়।

আস্তে আস্তে চার্জ ফুরোবে বাতির। তাই ঘরে ফিরলাম। ১৯০৩ সালে তৈরি এই বােংলায় থাকার মজাই আলাদা। খানিক দূরে ওয়াচ টাওয়ারের নীচে হয়ত এতক্ষনে বাঘ এসে গেছে। টাস্কার হাতিটা কা একলা ঘাস পাতা খেয়ে বেড়াচ্ছে। পরিষ্কার আকাশের নীচে রহস্যময়ী জঙ্গল এখন শীতল এক ঠিকানা।

কিভাবে যাবেন:দিল্লি পৌছে লকেনৌ হাইওয়ে ধরে হাপুর মোরাদাবাদ হয়ে সোজা রামনগর পৌছনো যায় সাড়ে পাঁচ ঘন্টায়। এই রাস্তা খুবই ভাল। রাস্তার ধারে ধাবা রয়েছে। ট্রেনে গেলে ওল্ড দিল্লি স্টেশন থেকে উত্তরাখন্ড সম্প্রকক্রান্তি এক্সপ্রেস ছাড়ে বিকেল চারটে। পৌছয় পনে নটায়। করবেট লিংক এক্সপ্রেস ছাড়ে রাত সাড়ে দশটায়। পৌছয় ভোর পাঁচটায়।

কোথায় থাকবেন: রামনগর শহরে অজস্র গেস্ট হাউজ় আছে। বনবাংলোতে থাকতে বুক করুন www.corbettonline.uk.gov.in

কখন যাবেন: ১৫ই নভেম্বর থেকে ১৪ই জুন অবধি পার্ক খোলা থাকে। ভাল সময় মার্চ।

মনে রাখবেন:গরম জামা সঙ্গে রাখবেন। বনবাংলোর ভেতরে কোন মেডিক্যাল এড নেই বা মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকেনা। তাই ওষুধপত্র সঙ্গে রাখবেন। ধিকালা ছাড়াও কোন বনবাংলোতে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। সঙ্গে টর্চ নেবেন। হাতির জঙ্গলে হালকা রঙের পোষাক পরাই বাঞ্চনীয়।

travel
facebook
facebook