Travel
Sananda fashion

মনোরম মুন্নার

ছবির মতো পশ্চিমঘাট, সবুজ উপত্যকা… প্রকৃতির অমোঘ হাতছানি। কেরলের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেন ইন্দিরা দাশ।

g

দিল্লি থেকে সাতসকালে উড়োজাহাজে উঠেছিলাম জানুয়ারির ঠান্ডায়। কোচি পৌঁছতে সাড়ে দশটা বাজল। এয়ারপোর্টের বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করে ছিল। চালক শাহজি স্মিত হেসে স্বাগত জানালেন চোস্ত ইংরেজিতে। যাক, মালয়ালি না জানলেও মনের ভাব আদানপ্রদান করা মুশকিল হবে না। একটু পরে আমাদের অবাক করে সুন্দর হিন্দিতে বলে উঠলেন চালক, “স্যর, আপকা ফ্লাইট বহুত সুবেহ মে থা, থক গয়ে হোঙ্গে। পাস হি আচ্ছা মোটেল মে চায় পি লিজিয়ে, চেঞ্জ কর কে ফ্রেশ হো লিজিয়ে, মুন্নার চলনে কে রাস্তে মে বহুত কুছ দেখ পায়েঙ্গে, হম শাম তক মুন্নার মে আপকে রিসর্ট পহুঁছ জায়েঙ্গে”। মোটেলে সাউথ ইন্ডিয়ান কফি আর উত্তাপম খেয়ে চনমনে হয়ে, জামাকাপড় বদলে গাড়িতে এসে উঠলাম। আমরা ট্যুরটা দুটো পর্বে ভাগ করেছিলাম। প্রথমে কেরলের পাহাড় ও অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করে তারপর নদী, সাগর ও ঝরনা দেখব ঠিক করেছিলাম।

গাড়ি সমতল ছাড়িয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরল। ঘণ্টাখানেক পরে ‘গ্রিনফিল্ড মুন্নার স্পাইসেস অ্যান্ড হার্বাল গার্ডেন’-এ থামলাম। গাইডের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে চিনলাম গোলমরিচ, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, কাজুবাদাম ও কোকো বিনসের গাছ। জায়ফল, আদা, অম্বা হলুদ দেখতে দেখতে জানতে পারলাম খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালেই ব্যাবিলন ও মিশরের লোকেরা কেরলে খুঁজে পেয়েছিলেন সুগন্ধী মশলার গাছগাছড়ার সম্ভার। পরবর্তীকালে আরব, গ্রিক ও রোমানরা কেরলের নাম দিয়েছিল ‘দ্য গার্ডেন অফ স্পাইসেস’। ভাস্কো-দা-গামা জলপথ আবিষ্কারের পর সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পায় কেরল। ভারতবর্ষে প্রায় ১৫০০০-২০০০০ বনৌষধির গাছ আছে, যার বেশির ভাগই কেরলে পাওয়া যায়। ঋগ্বেদ, অথর্ববেদ ও যজুর্বেদে বর্ণিত অসংখ্য গাছগাছড়া ছড়িয়ে রয়েছে কেরলের পাহাড়-অরণ্যে। ব্রাহ্মী, অশ্বগন্ধা, দারুহরিদ্রা, শতাবরী, অগস্ত্য গাছের পাশাপাশি এক কোণে দেখতে পেলাম সুন্দর অর্নামেন্টাল আনারস, ইনসুলিন প্লান্ট আর বড় গাছকে জড়িয়ে বেড়ে ওঠা ভ্যানিলা গাছ। পরবর্তী যাত্রাপথে দেখলাম ভালারা জলপ্রপাত। শীর্ণা ষোড়শীর মতো এই জলধারা ভরা বর্ষায় যৌবনবতী হয়ে ওঠে।

এরপর গেলাম অফ-রোড জিপ সাফারির অফিসে। আশেপাশের সুন্দর জায়গাগুলো জিপে করে দেখব। মন ভরে গেল প্রথম গন্তব্যস্থল দেখে — শ্রীনারায়ণপুরম ওয়াটারফলস। তখন সেখানে জলের স্রোত ছিল না। তবে জায়গাটি এত মনোরম, জলের মাঝে পাথরের এত রং, জলের উপর ঝুঁকে পড়া গাছের ডালের কানাকানি…সে এক অপূর্ব দৃশ্য। জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছনোর রাস্তাটি বেশ দুর্গম। এরপর একশো বছর পুরনো লোহার হ্যাঙ্গিং ব্রিজ পেরিয়ে পৌঁছলাম পোনমুড়ি ড্যাম। ১৯৬৩-তে পান্নিয়ার নদীর উপরে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য এই ড্যাম তৈরি করা হয়েছিল। কেরলের সবচেয়ে লম্বা নদী পেরিয়ার-এর শাখা পান্নিয়ার। ড্যামটি ২৯৪ মিটার লম্বা। জলে গভীরের শব্দ, অরণ্যের হাতছানি, শান্ত বাতাবরণ ভীষণ ভাল লাগল। এ বার আরও উঁচু পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছলাম এক স্বর্গরাজ্যে — ‘টপ স্টেশন’। ইদ্দুকি জেলার সবচেয়ে উঁচু এই স্থানটি ১৮৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মুন্নারের চা বাইরে পাঠানোর জন্য ইংরেজরা কুন্ডালা ভ্যালি রেলওয়ে তৈরি করেন। ‘টপ স্টেশন’ ছিল তার একটি টার্মিনাস। অস্কারপ্রাপ্ত ‘লাইফ অফ পাই’ সিনেমাতে ‘টপ স্টেশন’-এর দৃশ্য দেখানো হয়েছিল। প্যানোরামিক ভিউ, ছবির মতো পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, উপত্যকা, কোথাও বা রুপোলি ধারাজলে জলপ্রপাতের শোভা যেন কে সাজিয়ে রেখেছে।

অফ-রোড সাফারির অফিস হয়ে আমরা চললাম মুন্নার শহরের ভিতরদিকে, আমাদের রিসর্টে। ঠান্ডা বাড়তে লাগল। চালক জানালেন একমাত্র মুন্নারে ছাড়া কেরলে শীত বলে কোনও ঋতু নেই। ঘন গাছপালার মধ্যে পথ ধরে পৌঁছলাম গ্লেনমোর রিসর্টে। মোট সাতটি কটেজ, তা ছাড়া ডাইনিং হল, বাগান। জায়গাটির চারপাশে ঘন জঙ্গল। রাতে খেলাম কারিপাতা-সরষে দিয়ে কেরল চিকেন আর কোকোনাট রাইস। জানা গেল রাতে বেরোনো মানা। অরণ্যের গভীর থেকে ঘুরতে ঘুরতে এক-আধটি লেপার্ড এসে পড়তে পারে।

পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টে খেলাম তাজা তরমুজের রস, আপ্পাম (চালের দোসা), সম্বর আর নারকেলের চাটনি। খেয়েদেয়ে গাড়িতে চড়ে চললাম মুন্নার ফ্লোরিকালচার সেন্টারে। ভিতরে ঢুকে দেখি অজস্র ফুলের জলসা, পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে কেয়ারিতে গাছ। কেয়ারটেকাররা খেয়াল রাখছেন কেউ যেন ফুল না ছেঁড়েন কিংবা ছোট চারাগাছ বা নতুন কেয়ারি মাড়িয়ে নষ্ট না করেন। ডালিয়া, ক্রিস্যান্থিমাম, গোলাপ আর মরশুমি ফুল তো বটেই, ক্যাকটাস ও অর্কিডের ফুল দেখেও চোখ ফেরানো দায়!

পরের স্টপ ‘ফোটো পয়েন্ট’। নীলগিরির কোলে মাইলের পর মাইল চা-বাগানের পান্নাসবুজ ব্যাকড্রপ। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির মিতালির গল্প। চারপাশে সিলভার ওকের সারি, পাহাড়ি খোলামেলা হাওয়া জায়গাটিকে স্বনামধন্য করেছে। জায়গাটি মাট্টুপেটি যাওয়ার রাস্তায় অবস্থিত বলে গাড়ির চলাচল বেশি। কাছাকাছি নাল্লাথান্নি এস্টেটের টি-মিউজ়িয়ম ঘুরে এলাম। জানা গেল মুন্নারের আদি অধিবাসীরা মুথুভান গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন। ১৮৭০-এ জন মানরো ত্রিবাঙ্কুর ও চেন্নাইয়ের (তখন ম্যাড্রাস) মধ্যে বিবাদ মেটাতে এসে মুন্নারের প্রেমে পড়েন। মুন্নার নামটির অর্থ তিন নদীর মিলনস্থল। ইদ্দুকি জেলায় ৬০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই জায়গাটি দেখেই মানরো বুঝতে পেরেছিলেন এখানকার সুবিশাল কানন দেবান পাহাড়ের গায়ে চমৎকার চা-বাগান স্থাপন করা যাবে। তখন পুঞ্জর রাজের রাজত্ব। কেলা বর্মা রাজা অর্থের বিনিময়ে প্রথম চা-বাগান করার অনুমতি দেন। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় শার্প সাহেব আরও কিছু জমিতে চায়ের চাষ শুরু করেন, গোড়াপত্তন হয় ‘ফিনলে এস্টেট’-এর। পর্যটন বিভাগ বিংশ শতাব্দীতে মুন্নারকে আবিস্কার করে।

কিছুদূর গিয়ে পেলাম কুন্ডালা লেক। এশিয়ায় এখানেই প্রথম পাহাড়ের মধ্যিখানে আর্চের আকারে ড্যাম তৈরি হয়েছে। জল গভীর, স্থির। শিকারায় নৌকোবিহারের ব্যবস্থা রয়েছে। লেকের ধার ঘেঁষে পাহাড় ও উপত্যকায় বিখ্যাত নীল কুরুঞ্জি ফুল বারো বছর পর পর ফোটে। কাছেই ইকো পয়েন্ট — মুদ্রাপুজ়া, নাল্লাথান্নি ও কুন্ডালা পর্বতশ্রেণির মিলনস্থল। এক বিশাল জলাধারকে ঘিরে পাহাড়েরা দাঁড়িয়ে। জলের ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় ইন্ডিয়ান রবিন, ব্লু ফ্লাইক্যাচার ইত্যাদি পাখি। পরবর্তী গন্তব্যস্থল মাট্টুপেটি ড্যাম। পাহাড়ের মাঝখানে কংক্রিটের এই ড্যামে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এখানে ভোরে হাতিরা জল খেতে আসে, দেখা যায় অনেক রকমের পাখি। ড্যামের অন্য পাশে রিসার্ভয়ারে স্পিডবোটের ব্যবস্থা, বাচ্চাদের জন্য গেমস কর্নার জায়গাটিকে সুন্দর পিকনিক স্পট বানিয়ে তুলেছে। জলাশয়ে রঙিন মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেরলের বিখ্যাত প্রাকৃতিক পেডিকিওরের জন্য এইসব মাছ ব্যবহৃত হয়। লাঞ্চ সেরে আমরা কেনাকাটা সারলাম স্থানীয় গিফট শপ থেকে। পেলাম নানা ডিজ়াইনের সোনালি চওড়া পাড়ের কেরল কাসাভু শাড়ি, কলমকারি ডিজ়াইনার শার্ট, কাঠের সামগ্রী।

পর ফেরার পালা। উপরে ওঠার কষ্ট বেশি, তাই পথে মাঝে মাঝে বিশ্রাম করতে করতে উঠলাম আমরা। কাছেই এক রেস্তরাঁয় খেয়ে নিলাম। আমার অনুরোধ অনুযায়ী এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে কেনা হল কেরলের কলার চিপস, কারিপাতা আর নারকেল মেশানো মশলার প্যাকেট। মনটা খারাপ হচ্ছিল ড্রাইভার সাহেবকে বিদায় জানাতে। ভুলে না যাওয়ার অঙ্গীকার করলেন আমাদের পথের সাথী। এয়ারপোর্টে পৌঁছে হাত তুলে বিদায় জানালেন। উড়ানে দিল্লি ফিরতে ফিরতে বার বার ভেবেছি তাঁর কথা আর ঈশ্বরের আপন দেশ, কেরলের সৌন্দর্যের কথা।

কীভাবে যাবেন ?
কলকাতা থেকে ফ্লাইটে কোচি আসতে পারেন। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকেও কোচি আসার অনেক ট্রেন পাবেন। এয়ারপোর্ট বা স্টেশন থেকে মুন্নার আসার গাড়ি পাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন ?

গ্লেনমোর রিসর্ট, মুন্না
ডাবল বেডরুমের ভাড়া ২৫০০ টাকা থেকে শুরু।
যোগাযোগ: ৯৮৪৬৭১০৪৫২

travel
facebook
facebook