Travel
Sananda fashion

খেলনার বাড়ি সাওয়ান্তওয়াড়ি

আম, আপেল, কলা, বুড়ো-বুড়ি, জিরাফ, বাস, বঁটি আরও কত কি! সবই কাঠের তৈরি। খেলনার রঙিন রাজ্য সাওয়ান্তওয়াড়িতে ফেলে আসা ছেলেবেলা ফিরে পেতে ঘুরে আসুন।

g

বর্ষার গোয়া দেখব বলে প্ল্যান করেছিলাম। ডিভার আইল্যান্ডে দু’দিন কাটিয়ে রওনা দিলাম সিন্ধুদুর্গের উদ্দেশে। নর্থ গোয়ার অনন্য ডেস্টিনেশন। বেড়াতে গিয়ে ভাল থাকা, খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা জিনিস আমি খুঁজে বেড়াই, স্টোরি। মাথায় ট্র্যাভেল ইস্যুর কনটেন্ট প্ল্যান চলতেই থাকে। নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন, ওয়র্ক অ্যান্ড লেজ়ার মিলেমিশে আমার কোনও অসুবিধে ঘটায় না। আর তাই সিন্ধুদুর্গ, আর সেখানেই সাওয়ান্তবাড়ি। ল্যাকার কোটেড কাঠের খেলনার জন্য বিখ্যাত।

পাঞ্জিম থেকে ৭০ কিলোমিটার। সিন্ধুদুর্গের নন্দন ফার্মসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। সকাল ৯টা নাগাদ বেরিয়ে সাড়ে এগারোটায় পৌঁছে গেলাম নন্দন ফার্মস। লাগেজ রেখে, লাঞ্চ সেরে বেরিয়ে পড়লাম সিন্ধুদুর্গ দর্শনে। মহারাষ্ট্রের কোঙ্কন উপকূলে, সিন্ধুদুর্গের মধ্যেই ছোট্ট এলাকা সাওয়ান্তওয়াড়ি। আগে নাম ছিল সুন্দরওয়াড়ি। সার্থকনামা বলতেই হবে। চারিদিকে বৃষ্টিভেজা সবুজ গাছগাছালি, সমুদ্রের হাওয়া আর অনন্ত সি-ফুড। সব মিলিয়ে ছবির মতো সুন্দর এই অঞ্চল। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রের শাসক পরিবার খেম-সাওয়ান্ত এর নামানুসারে নাম হয় সাওয়ান্তওয়াড়ি। নরেন্দ্র পাহাড়ের এপর রাজার বাড়ি, সামনে বিশাল লেক মোতি তালাও দেখে পৌঁছলাম রঘুনাথ মার্কেট। কিছুক্ষণ আগেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিভেজা বাজারে ঢোকার লোভ সামলাতে পারলাম না। সবুজ, সতেজ সবজি তো আছেই। কিন্তু সব ছাপিয়ে রঙে, গন্ধে মাত করেছে কলাপাতার ওপর ঝুড়ি ভর্তি স্বর্ণচাঁপা। বৃদ্ধা দোকানি ফুল সাজিয়ে বসেছেন, ছবি তুলতেও বেশ উৎসাহী দেখলাম। বলা মাত্র রাজী হয়ে গেলেন। বাজার ঘুরে খেলনার দোকানে হাজির হলাম। রাস্তার দু’ধারে লাল, নীল, সবুজের মেলা বসে গেছে। ঝুড়ি ভর্তি রঙিন ফল, মাথা নাড়া পুতুল, লম্বা গলার জিরাফ আরও অনেক কিছু। কথায় কথায় জানতে পারলাম স্থানীয় মানুষজনের হাতে তৈরি কাঠের খেলনার স্তিমিত ব্যবসাকে জনপ্রিয় করে তোলেন রাণী সত্ত্বশীলা দেবী। সে বহু যুগ আগের কথা। সেই ট্রাডিশন আজও চলেছে। একটু বড় একটা দোকানের ভিতরে ঢুকে দেখলাম একটি ২০-২২ বছরের একটি মেয়ে এক মনে কাঠের পুতুল রং করে চলেছে। কী সুন্দর সুন্দর খেলনা! চওড়া রঙিন বঁটি দেখে এক নিমেষে চলে গেলাম রাসবিহারি মোড়ের রথের মেলায়। মায়ের হাত ধরে জুলজুল চোখে ঘুরে বেড়াতাম কাঠের খেলনাবাটির লোভে। ছোট বড় নানা মাপের থালা,বাটি, বঁটি, বালতি, সংসার করার সব আয়োজন এক ঝুড়িতে। কাঠের খেলনার মাঝে খুব সুন্দর চৌকো বাক্স চোখে পড়ল। খুলে দেখি কাঠের গোল গোল কয়েকটি পিস। দেখতে খানিকটা কোস্টারের মতো। জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই দোকানি জানালেন, গঞ্জিফা। এই অঞ্চলে অতি জনপ্রিয়। গঞ্জিফা আসলে গোলাকার তাস। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই গঞ্জিফা ট্রাডিশন। প্রতিটি তাসের ওপর নানা ধরনের রঙিন ছবি আঁকা। বেশিরভাগই দশাবতারের গল্প। রং ও রেখার মুনশিয়ানা সত্যিই নজর কাড়ে। ল্যাকার পেন্টিংয়ে সাওয়ান্তবাড়ির শিল্পীরা সত্যিই দক্ষ। বিশেষত এই অঞ্চলের চিতারি সম্প্রদায়ের কারিগরি জাদুতে ফলের খোসার টেক্সচার, বাসের স্টিয়ারিং কিংবা বৃদ্ধ মানুষের মুখের বলিরেখা অবলীলায় সত্যি মিথ্যে গুলিয়ে দিতে পারে। বৃদ্ধ দোকানি আমাদের বুঝিয়ে দিলেন তাঁদের এই প্রাচীন পদ্ধতি। কাঠের যে খেলনাটি রং করা হবে, প্রথমে আঠা আর জ়িঙ্ক অক্সাইডের মিশ্রণ লাগানো হয়। বাঁশের ক্ষেত্রে প্রথমে কাপড় আটকিয়ে তারপর এই মিশ্রণ লাগানো হয়। উজ্জ্বল রঙের তীব্রতা ও স্থায়িত্বের জন্য এই পেলব ভিতের একান্ত প্রয়োজন বলে জানান দোকানি। ভাল লাগে এই ভেবে যে আজও সুপ্রাচীন এই পদ্ধতিকে জিইয়ে রাখতে পেরেছেন সাওয়ান্তওয়াড়ির শিল্পীরা। ঘুরে ঘুরে চোখের আশ মেটে না। নানা তথ্য, গল্প আর ঝুড়ি ভর্তি হরেকরকম ছেলেবেলার প্রিয় জিনিস বুকে নিয়ে ফিরে এলাম নন্দন ফার্মসে।

travel
facebook
facebook