Travel
Sananda fashion

ঘুমের দেশ তামসং

নির্জন, নিরিবিলি, শহুরে কোলাহল থেকে অনেক দূরে। চারদিকে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ আর সামনে রুপোলি কাঞ্চনজঙ্ঘা। চামং ভ্যালির তামসং ঘুরে এলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়।

g

গত বছর ভূত চতুর্দশী আর দীপাবলিতে শব্দবাজির আতঙ্কে পালিয়েছিলাম মহানগরের ভিড় ছেড়ে। দার্জিলিংয়ের ঘুম ছাড়িয়ে কিছুটা পশ্চিমে নেমে গিয়ে তামসং চা বাগান। একটু নিরিবিলি খুঁজতেই যাওয়া। অনলাইন বুকিংও পেয়ে গেলাম। বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে পেরলাম সুকনা মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। টি-এস্টেটের মধ্যে দিয়ে পথ চলা। ঝকঝকে সবুজ চারপাশ আর মধ্যে চা বাগিচা। নদী আর সেতু পেরিয়ে চলেছি। চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ধানখেত, ভুট্টাখেত ছাড়িয়ে চলেছি উপরের দিকে। যত উচ্চতা বাড়ে তত বাড়ে ঠান্ডা হাওয়ার ধারা। হঠাৎ শোনা গেল সুউচ্চ পাহাড়ের মাথা থেকে ঝোরার কলকলানি। ক্রমশ সবুজ আরও ঘন হয়ে আসে। মেঘের মধ্যে দিয়ে চলছি কখনও, কখনও আবার কুয়াশা আদর করে যায়। এসে গেল টয় ট্রেনের বিখ্যাত সেই ট্র্যাক। ঘুম এল বুঝি। পাহাড়, মাটি ডিঙিয়ে, মানুষের ঘরদোরের উঠোনের কোল ঘেঁষে, ঘুমের এই টয় ট্রেনের ট্র্যাক। ট্রেন আসার আগে-পরে স্থানীয় মানুষের লেপ কম্বল শুকোয় এই ট্র্যাকে। লোকেরা উবু হয়ে বসে আড্ডা দেন এখানেই। ট্রেন আসার শব্দে হুড়মুড়িয়ে সব পত্রপাঠ উঠিয়ে ফেলেন তাঁরা। এবার পিটস্টপ মধ্যাহ্নভোজনের। কার্শিয়ং-এ WBTDC-এর পরিছন্ন হোটেলে চিকেন মোমো আর স্যুপ দিয়ে উদরপূর্তি করে আবারও চললাম আমরা, রাজকীয় ধুতরোর খামখেয়ালি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কোথাও হলুদ, কোথাও সাদা আবার কোথাও ধুতরো আগুনরঙা। বিকেলের রোদ থাকতে থাকতেই পৌঁছে গেলাম তামসং টি রিট্রিটে। ব্রিটিশ আমলের চা বাগান ঢেলে সাজানো। বাগানের ম্যানেজারের পূর্বতন বাংলোটি এখন রিসর্টে পরিণত। ঘরের সংখ্যা মোটে চারটি। তাই ট্যুরিস্ট কম। পেল্লাই বেডরুম, ডাইনিং রুম, টয়লেট আর কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুখ করে উন্মুক্ত বারান্দা, মন ভরে গেল। ফুলে ফুলে ছয়লাপ চারদিক। সামনে বিশাল সবুজ লন। বাইরে দিয়ে পয়েনসেটিয়ার বেড়া। টুকটুকে লাল ফুল ফুটে রয়েছে। বাগানের সামনেই প্রাচীন দুটি ক্যামেলিয়া গাছ। ক্যামেলিয়া ফুটে আছে থোকা থোকা।

পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গেই উষ্ণ অভিনন্দন গলায় সিল্কের উত্তরীয় পরিধানে আর সেই বিখ্যাত সুগন্ধী জৈব চায়ের আমন্ত্রণে। পথের ক্লান্তি নিমেষে উধাও। পরের দিনের প্ল্যান ছকে নিলাম। ভোরে উঠেই ঘরের জানলার পরদা সরিয়ে দিতেই হাজির হয়ে গেল রুপোলি পোশাক পরা কাঞ্চনজঙ্ঘা। আমরা উৎফুল্ল। শাল, টুপি জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় সূর্যের প্রথম সোনা রোদ্দুর পড়ার মুহূর্তটা ডিজিটাল ক্লিকে ধরার চেষ্টা করলাম।এই রিট্রিটে মাত্র কয়েকজন অতিথি তখন। দুপুর আর রাতের খাবারের অর্ডার নিলেন ম্যানেজার। খুবই অতিথিবত্সল। খাওয়াদাওয়ার গুণমানও উত্কৃষ্ট।
তামসং চা বাগানের স্থাপনা কীভাবে হয়েছিল জানলাম। দার্জিলিংয়ের সোনার উপত্যকায় উচ্চমানের চা চাষের পেছনে নাকি রয়েছে স্থানীয় হিন্দু দেবী তামসার আশীর্বাদ। শোনা যায় পাহাড়ের মাথায় কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে প্রায় পাঁচহাজার ফুট উঁচুতে খাড়াই পাহাড়ে সর্বক্ষণ জেগে থাকেন এই দেবী। ঘুটঘুট্টে অন্ধকার এক গুহার মধ্যে এই জাগ্রত দেবীর বাস। পাহাড়ের চূড়োয় গুহামন্দিরের মাথায় সর্বক্ষণ ঝরে পড়ছে এক পাহাড়ি ঝোরা, যেন নিজেকে সে দেবীর কাছে সমর্পণ করেছে। মন্দিরের পাশে প্রাচীন এক বকুলগাছ। সবুজে সবুজ আশপাশ। অজস্র ফার্নের সমাহার সেখানে। ভেজা ভেজা গন্ধ চারপাশে। আর এই দেবীকে উত্সর্গ করেই তাঁর নামে চামং ভ্যালির তামসং চা বাগান। টি এস্টেট স্থাপিত হয়েছিল ১৮৬৭ সালে। তখন ব্রিটিশ রাজত্ব। স্বাধীনতার বহু পরে হয়েছে হাতবদল। স্থানীয় মানুষদের উপজীবিকা এই চা-বাগানকে কেন্দ্র করে। এখন প্রায় ৪৮০জন কাজ করেন এখানে। এই মানুষগুলোর থাকার ব্যবস্থা, খাওয়াদাওয়া, ওষুধপত্র সবকিছুর বন্দোবস্ত করতে হয় চা-বাগানকে।

তামসং-এর সুগন্ধী চা হল দার্জিলিংয়ের বিখ্যাত চা। সম্পূর্ণ অর্গ্যানিক এই চা। কোনও রকম রাসায়নিক সার কিম্বা কীটনাশক স্প্রে ব্যবহার করা হয়না এই চা বাগানে। আর এখানকার অধিবাসীদের দৃঢ় বিশ্বাস তামসা দেবী সর্বক্ষণ পাহারা দিচ্ছেন এই বাগানকে। চা বাগানের সবুজ, সুর‌্যিয়ালিস্টিক ল্যান্ডস্কেপ আর মন্দিরের মাহাত্ম্য বেশ অনুভূত হয় মাটিতে পা দিলেই। সর্বোপরি তামসং থেকে দার্জিলিং হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জটা অপূর্ব দৃশ্যমান। দূরের রুপোলি পাহাড় চূড়ো, হালকা ঠান্ডার আমেজ, অনবদ্য জলবায়ু যেন পুরোপুরিভাবে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তামসং চায়ের সুগন্ধী কেমিষ্ট্রির সঙ্গে। এখানকার কোয়ালিটি কন্ট্রোল বেশ জবরদস্ত তা চায়ের ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে গিয়েই বুঝলাম। চা পাতা প্লাকিং থেকে প্যাকেজিং সব হয় অত্যন্ত উত্কর্ষের সঙ্গে। বাগানে ঢোকার আগে বহু স্থানে দেখা গেল জৈব সার বা জঞ্জাল থেকে কম্পোস্টিং-এর সুব্যবস্থা। আমার এই প্রথম চায়ের ফ্যাক্টরি দেখা। ঘুমের এই প্রত্যন্ত গ্রামে পাহাড়ি পাকদণ্ডী বেয়ে হাঁটতে গিয়ে খেয়াল করেছি কিছুদূর অন্তর অন্তর চা গাছের পাতা ওজন করার শেড। স্থানীয় যুবতী, প্রৌঢ়া এবং বৃদ্ধারা চা পাতা তুলে এনে সেখানে আসেন আর প্রতিদিন ৪-৫ কেজি করে চা পাতা তাঁদের সেখানে জমা দিতে হয়। সংগৃহীত সব চা পাতাকে ফ্যাক্টরির মধ্যে ইলেকট্রিক ফ্যানের সাহায্যে শুকনো করা হয়। ফ্যাক্টরির মধ্যে ঢোকার আগে হাত ধুয়ে নিতে হয় কারণ কোনওরকম জীবাণুর সংক্রমণ হলে চা পাতায় ছত্রাক হয়ে পুরো ছেয়ে যেতে পারে। মাথায় টুপি আর এপ্রন পরে এগিয়ে গেলাম। ইলেকট্রিক টারবাইনের দাপুটে হাওয়ায় ধাতব ট্রে-এর ওপরে সবুজ চা পাতা শুষ্ককরণের পালা চলছে। এরপর প্রসেসিং-এর বহু স্তর পেরিয়ে সেই চা প্যাকেট করা হয়।

অপূর্ব মনোরম এই চা বাগানের সামনেই হিমালয়ের হাতছানি। তৃতীয় দিন গেলাম নদী ছোটা রঙ্গীতের সঙ্গে মোলাকাত করতে। আমাদের সঙ্গে চললেন রিসর্টে আসা দুই বিদেশিনী মহিলা। একজন অস্ট্রিয়ার মধ্যবয়সি আর একজন আমেরিকার সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা। তাঁদের সঙ্গে গল্প করতে করতে পেরিয়ে গেলাম পাহাড়ি পথ। কখনও লেমনগ্রাসের ঝোপের মধ্যে দিয়ে, তো কখনও ভুট্টার খেতের মধ্যে দিয়ে। চা বাগানের দুটি পাতা, একটি কুঁড়ির মাথায় তখন ভোরের সোনা রোদ এসে পড়েছে আর স্থানীয় মেয়ে-বউরা পাহাড়ের গা বেয়ে তরতর করে উঠে চলেছে চা পাতা তোলার জন্য। চা গাছের পুরোটাই অক্ষত থাকবে। শুধু তাঁরা তুলে নেবেন দুটি পাতা আর তার মধ্যিখানের একফোঁটা সবুজকে। সামনেই ভ্যালির মতো সমতল জায়গা দেখতে পেলাম। সেখানে ধান পেকে সোনা হয়ে নুয়ে পড়েছে।

ধানখেত পেরিয়ে ছোটা রঙ্গীতের কাছে আসতেই নদীর কলকলানি কানে এল। হিমালয়ের বরফগলা জলে পুষ্ট তার শরীর। নদী বিছানায় পাতা রয়েছে অজস্র ফুল, রাঙা, কুট্টি, আন্না, ছোট, বড় পাথর। নদীর উপর দিয়ে সাসপেনশন ব্রিজ। নেমে গেলাম তরতর করে নদীর বুকে জলের খবর নিতে। জুতো মোজা খুলে জলে নামতেই টের পেলাম কী প্রচণ্ড ঠান্ডা জল। তারপর বিশাল সমতল এক পাথরের ওপর বসে গল্প জুড়লাম দুই মেমসাহেবের সঙ্গে। একজন থার্মোস খুলে এগিয়ে দিলেন গরম গ্রিন টি। বেশ কিছুটা রোদের ওমে শরীর সেঁকে নিয়ে এবার ফেরার পালা। দু’ধারে বড় এলাচের জঙ্গল, আদাগাছের চাষ হয়েছে। জঙ্গলে নাকি চিতাবাঘ‌ও বেরয়, জানাল স্থানীয় গাইড।

ছোটা রঙ্গীত দেখে এসেই মনে হল ঠান্ডা লেগে গেছে। রিসর্টের ম্যানেজার এক গ্লাস গরম জলে মধু আর ঝিরিঝিরি করে কাটা আদা দিয়ে খেতে দিলেন। অদ্ভুত সুন্দর এই স্বাস্থ্যকর এই পানীয় সেবনে বেশ তৃপ্তি পেলাম। সেদিন আবার দীপাবলি। ঘুম শহরের দিক থেকে পটকা ফাটার আওয়াজ কানে এল। সেজে উঠল চা বাগানটির আনাচকানাচ। বিকেলে হতেই হাউজ়কিপিং-এর মেয়েরা দরজায় ঝুলিয়ে দিল গাঁদার মালা। বাগানের পোর্টিকোয় সাদা চাদর বিছানো দেখে জিজ্ঞেস করতেই বলল সন্ধের বিশেষ অনুষ্ঠানের কথা। সন্ধ্যা হতেই উপস্থিত সবাই মিলে প্রদীপ জ্বালালাম। আশপাশের চা-বাগানের ম্যানেজাররা তাঁদের পরিবার নিয়ে যথাসময়ে উপস্থিত হলেন। দীপাবলির শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর যে যার মত বারান্দাতেই আসন গ্রহণ করলাম। শুরু হল অনুষ্ঠান। আমাদের ভাইফোঁটার অনুরূপ ওইদিন আবার নেপালিদের হয় ‘ভাইটিকা’। ভাইদের মঙ্গলকামনায় বোনেরা ভাইয়ের কপালে লম্বা টিকা এঁকে দেন। দীপাবলিতে পাঁচ দিন ধরে এই ভাইতিলক চলে নেপালে। প্রতিপদে ভাইদের জন্য বোনেরা একত্র হয়ে নাচগান করে টাকা তুলে জিনিসপত্র কিনে ভাইয়ের কাছে যান আর দ্বিতীয়াতে বোনেদের জন্য ভাইরা বিশেষ ঘটা করে খাদ্য ও পানীয়ের আয়োজন করেন। সেই থিমের ওপরে নেপালি ট্রাইবরা এসে আমাদের সামনে সে রাতে নাচগান পরিবেশন করল। আমরাও সামিল হলাম।

সূর্যের প্রথম আলোতে ভোরের চা-বাগানের রূপ একরকম। সূর্যাস্তের প্রদোষে আর একরকম। চা-ফুল গন্ধরাজের মতো। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘায় সোনাগলা রোদ এসে পড়ে আমাদের কাঠের ঘরে। ধীরপায়ে গিয়ে দরজা খুলে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যাই। অন্ধকারে এ যেন ভূতবাংলো। ছমছমে পরিবেশ। রকমারি ফার্ন আর শীতফুলের মাঝে হারিয়ে ফেলি নিজেকে। দূরের রহস্যময় অন্ধকারে তখন কালো পাহাড়ের গায়ে হীরককুচির মতো জ্বলজ্বল করছে নগরায়নের চিহ্ন। নগরের নাম দার্জিলিং। যার টানে বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে।

কীভাবে যাবেন

কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার একাধিক ট্রেন আছে। সেখান থেকে গাড়িতে করে তামসং। বাগডোগরা থেকেও যেতে পারেন। সময় লাগে তিন ঘণ্টার একটু বেশি।
রাস্তায় মোমো খেতে ভুলবেন না যেন!

কোথায় থাকবেন

তামসং টি রিট্রিট

যোগাযোগ:৯৮৩০০২০৬২০

ই-মেল: [email protected]

ওয়েবসাইট: www.darjeelingchiabari.com

এ ছাড়া দার্জিলিং, ঘুমে প্রচুর
হোটেল, হোমস্টে আছে।

অন্যান্য আকর্ষণ

দার্জিলিং, ঘুম, কার্শিয়ং ঘুরে আসতে পারেন।

travel
facebook
facebook