Your child
Sananda fashion

জেন্ডার নিউট্রাল পেরেন্টিং

রেসিং কার বা ক্রিকেটের পিচ নয় আপনার ছেলের মন টানে পুতুলের বিয়ে! ওদিকে মেয়ের পছন্দ বক্সিং! এতে কপাল চাপড়াবার কিছু নেই। খেলাধুলোর জেন্ডার নিউট্রালিটি বলে কিছু হয় না। এই বিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

g

২০০০ সালের সুপারহিট ‘বিলি এলিয়ট’ ছবিটার কথা মনে আছে? ছবির নায়ক, বছর এগারোর বিলির একটাই স্বপ্ন – এক সফল পেশাদার ব্যালে ড্যান্সার হওয়া। কিন্তু তার পরিবার সেটা মানলে তো! তার রক্ষণশীল বাবা তাকে জোর করে বক্সিং ক্লাসের দিকে এর দিকে ঠেলে দেন। কারণ? সমাজে ছেলেদের ব্যালে ড্যান্সিং এর মতন ‘মেয়েলি’ কার্যকলাপে ছেলেদের অংশগ্রহণ করাটা যে ‘ভাল দেখায় না’! পরবর্তীকালে অবশ্য বিলির বাবা ছেলের অসামান্য প্রতিভা এবং অধ্যাবসায় প্রত্যক্ষ করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করবার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। শেষপর্যন্ত বিলির স্বপ্ন সার্থক হয়। লন্ডনের স্বনামধন্য রয়্যাল ব্যালেট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় সে।

এতো গেল রূপোলি পর্দার কথা। বাস্তবজীবনেও কিন্তু বিলি’র মতো অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ের শৈশবই কিন্তু ‘জেন্ডার স্টিরিওটাইপ’ নামের এক কদর্য প্রথার শিকার হয়ে অকালেই শুকিয়ে যায়। কি এই জেন্ডার স্টিরিওটাইপ? এটি মূলত একটি ভ্রান্ত ধারণা যে জেন্ডার বা লিঙ্গ অনুযায়ী কিছু চিরাচরিত বা বাঁধাধরা বৈশিষ্ট্য বা ‘নিয়ম’ রয়েছে, যা নিষ্ঠার সঙ্গে না মেনে চললে সমাজে অপদস্থ হতে হয়। এই স্টিরিওটাইপ বা আদ্যপান্ত ক্ষতিকর ধারণাগুলি শৈশব থেকেই ছেলেমেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেন অবিভাবকেরা যার ফলে তারা মান্ধাতা আমলের এই সমস্ত পশ্চাদগামী ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে যায় যা পরবর্তীকালে তাদের জীবনে আনতে পারে নানাবিধ সমস্যা। জেন্ডার স্টিরিওটাইপ এই ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই এড়ানো যায় জেন্ডার নিউট্রাল পেরেন্টিং এর মাধ্যমে। কি এই জেন্ডার নিউট্রাল পেরেন্টিং ? এটি এক আধুনিক শিশু প্রতিপালনের কায়দা যেখানে জেন্ডার বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বাচ্চাদের ওপর কোনও প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া হয় না, বা পক্ষপাত করা হয় না। যেহেতু এই ক্ষেত্রে বাচ্চাদের লিঙ্গের নিরিখে নয় মানুষকে যাচাই করার কুশিক্ষাটি দেওয়া হয় না, তাই তারা নারী এবং পুরুষের মধ্যে কোনও রকম ভেদাভেদ না করে চলার গুণটি অর্জন করে।
কীভাবে নিয়োগ করবেন এই পেরেন্টিং এর আদবকায়দা?

আগে নিজেকে পরোখ করুন - বাচ্চাদেরকে শিক্ষা প্রদান করবার আগে, একবার আয়নায় নিজের দিকে তাকান। সন্তানের জন্য এক আদর্শ রোল মডেল হতে গেলে, আগে আজীবন ধরে যে সমস্ত ক্ষতিকর ধ্যানধারণা আপনি পোষণ করেছেন, সেগুলি বিসর্জন দিন। বাচ্চাদের মধ্যে সুস্থ মনোভাব গড়ে তোলার আগে নিজের মনোভাবে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন।

বস্তাপচা ধারণা ত্যাগ করুন – নারীত্ব বা পুরুষত্বের নির্দিষ্ট কোনও বৈশিষ্ট্য বা মাপকাঠি নেই। আপনার পুত্রটির কি তথাকথিত ‘পুরুষোচিত’ ক্রীড়া যেমন কুস্তি, খেলাধুলো, ইত্যাদিতে তেমন উৎসাহ নেই? বরং সে তার অবসর সময়ে পুতুল খেলা, ডিজ়াইনিং, পেন্টিং এর মতন ‘মেয়েলি’ কাজকর্মেই মশগুল রয়েছে? তার মানে এই নয় যে সে তার ক্রীড়াবিদ ক্লাসমেটের থেকে কোনও অংশে হীন বা খাটো। তাকে নিরুৎসাহ না করে, তার যে দিকে সহজাত প্রতিভা রয়েছে, সেইদিকেই তাকে উৎসাহ জোগান। এমনও তো হতে পারে, যে একদিন সে বিশ্ববিখ্যাত কোনও শেফ বা ফ্যাশন ডিজ়াইনার হয়ে উঠল! তাই গাড়িঘোড়ার চাইতে ঘটিবাটিই যদি তার মন টানে, তাকে সমর্থন করুন।

ঘরের কাজকর্মে ছেলেমেয়েদের নিয়োগ করুন – ঘরোয়া কাজকর্মের ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনওরকম বাছবিচার করবেন না। আপনার পুত্রকে রান্নাবান্নার কাজে লাগান। আপনার কন্যাটিকে বাজারের কাজে, যন্ত্রপাতি সারানোর কাজে প্রশিক্ষণ দিন। এতে তাদের মধ্যে সাম্যবোধ যে জাগবে তাই নয়, তারা স্বাবলম্বীও হয়ে উঠবে।

ছেলেমেয়েকে একসঙ্গে খেলাধুলা করতে উৎসাহ দিন – ক্রিকেট হোক বা পুতুলের বিয়ে ঈপনার খুদে যেন লিঙ্গের ভিত্তিতে তার কোনও সমসাময়িক কে খেলা থেকে বঞ্চিত করছে কিনা সেই দিকে খেয়াল রাখুন। ক্রিকেট টীমে যে মেয়েরাও যোগ দিতে পারে বা বার্বির সংসার যে একজন ছেলেও দিব্যি গোছাতে পারে, সেই শিক্ষা দিন খুদেদের।

লিঙ্গ বৈষম্যের ব্যাপারে সতর্ক করুন – এই যুগেও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য এক অপ্রিয় সত্য। রাস্তাঘাটে নিরাপত্তার অভাবে প্রাপ্তবয়স্ক অনেক মেয়েই অবিভাবক ছাড়া বোরোতে পারেন না। বাসে, ট্রামে কর্মক্ষেত্রে, মেয়েদের আজও প্রায়ই নিগ্রহের শিকার হতে হয়। এই কিছুদিন আগে অবধি ম্যারিট্যাল রেপকে যৌন নিগ্রহের পর্যায়ে ফেলা হত না। একটু বড় হলে এই সমস্ত সমস্যার ব্যাপারে আপনার সন্তানকে সতর্ক করুন। এতে কিছুটা হলেও ওর মধ্যে সচেতনতা আসবে।
তার মানে কিন্তু এই নয় যে আপনার ছেলেমেয়েকে তাদের পচ্ছন্দের খেলাধুলো থেকে বঞ্চিত করবেন। আপনার ছেলে যদি ক্রিকেট, ফুটবল নিয়েই মশগুল থাকতে চায়, বা আপনার মেয়ে যদি পুতুলের সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে থাকতে দিন। কিন্তু নির্দিষ্ট খেলাধুলার প্রতি তার ভালবাসা যথার্থ না কি আরোপিত ( বন্ধুবান্ধব বা আপনার ইন্ধনে) সে দিকে খেয়াল রাখতে ভুলবেন না।

facebook
facebook