Your child
Sananda fashion

দুষ্টুমি এবং শাস্তি

বাচ্চারা তো দুষ্টুমি করবেই! তবে ব্যস্ত বাবা-মায়ের কাছে দুষ্টুমির নালিশ বিরক্তিকর ব্যাপার। সেই জন্যই দাওয়াই হিসেবে অভিভাবকরা বেছে নেন শাস্তি। কিন্তু সত্যিই কি শাস্তি দুষ্টুমি বন্ধ করতে কার্যকর? রইল জরুরি পরামর্শ।

g

তৃণা অফিসে বেরিয়ে যায় সকাল ৯টায়। বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে ওর প্রায় রোজই সাতটা বেজে যায়। বাড়ি ফিরে কোথায় দু’দণ্ড বসে জিরোবে তা নয়, সবাই মিলে নালিশের ঝাঁপি খুলে ওকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। ‘কুরচি আজ বাগানের সব ফুল ছিঁড়ে নষ্ট করেছে।’ ‘কুরচি দামি ফুলদানিটা ভেঙে ফেলেছে।’ ‘কুরচি বসার ঘরের দেওয়ালে স্কেচ পেন দিয়ে হিজিবিজি কেটেছে।’ ‘কুরচি সব খাবার ফেলে ছড়িয়ে নষ্ট করেছে।’ কুরচি তৃণার ৮ বছরের দস্যি মেয়ে। বকেঝকে, মেরে, ভয় দেখিয়ে কুরচিকে দমিয়ে রাখা যায় না। সব সময় ও মনে মনে দুষ্টুমির নতুন ফন্দি আঁটছে। এক মুহূর্ত চুপ করে বসে থাকলে যেন ওর গায়ে জ্বর আসে। আর কুরচি যত দুষ্টুমি করে, অভিযোগের আঙুল ওঠে তৃণার দিকে। এইটুকু একটা মেয়েকে শাসন করতে পারে না তৃণা? তৃণার হয়েছে সমস্যা, ৮ বছরের ছোট্ট মেয়েটাকে কীভাবে শাসন করবে বা শাস্তি দেবে, সেটা কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারে না ও…

ডিসিপ্লিন আর শাস্তির মধ্যে সূক্ষ্ম ব্যবধানটা আমরা অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। ডিসিপ্লিন যে শিক্ষার অন্য নাম, এ কথাটা সন্তানকে মানুষ করার সময় ক’জন বাবা-মা মনে রাখেন? কোনটা ঠিক, কোনটা অন্যায়, কোথায় কার সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়, বড়দের সম্মান কেন করা উচিত, রাগ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, এইসব ছোটখাটো শিক্ষার সামগ্রিক রূপই ডিসিপ্লিন। ছেলেবেলা থেকে ব্যবহারের খুঁটিনাটি শেখানোর দায়িত্ব কিন্তু বাড়ির বড়দের। তবে বকে বা মেরেধরে নয়, আদর করে। ভালবেসে। কারণ ডিসিপ্লিনের ভিত্তিই হল একে অপরকে ভাল করে বুঝতে শেখা।

প্রত্যেকটি শিশুর টেম্পারামেন্ট আলাদা। আপনি যেভাবে বড় হয়েছেন বা আপনার অন্য সন্তানকে যেভাবে মানুষ করেছেন, এই শিশুটির ক্ষেত্রে সেই নিয়মগুলো না-ই খাটতে পারে। বাচ্চাকে ডিসিপ্লিনড করার আগে ওর মানসিক গঠন, মুড, স্বভাব ভাল করে লক্ষ করুন। তারপর ঠিক করুন কীভাবে ওকে ট্যাকল করবেন।

নিজের ব্যবহার, কথাবার্তার দিকে বিশেষ নজর দিন। আপনার সন্তানের কাছে আপনিই রোলমডেল। আপনি কী করে ওর সঙ্গে কথা বলছেন, অন্যদের সঙ্গে কীভাবে বিহেভ করছেন, তা বাচ্চার মনে একটা চিরস্থায়ী ছাপ ফেলে। আপনি যদি কথায় কথায় তর্ক বাধান, ভায়োলেন্ট হয়ে যান বা কুকথা বলেন, তা হলে আপনার অজান্তে ও কিন্তু এগুলো শিখে ফেলে তৎক্ষণাৎ প্রয়োগ করবে। এ ছাড়াও অতিরিক্ত স্নেহ, প্রত্যেকটি বায়না মেনে নেওয়া আমাদের সময় বাঁচায় ঠিকই, কিন্তু এর ফলে বাচ্চারা সহজেই আমাদের দুর্বলতা বুঝে ফেলে এবং তার সুযোগ নেয়।

ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে দৃঢ় থাকুন। ও কী করবে বা করবে না, সেটা ঠিক করার সময় ওকেও সঙ্গে নিন। বাড়িতে, বাইরে, চেনা-অচেনা মানুষের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করবে তা নিজেদের মধ্যে অভিনয় করেও ঠিক করতে পারেন। এতে বাচ্চা বুঝতে শিখবে ওর কাছ থেকে আপনি ঠিক কী আশা করেন। তবে খেয়াল রাখুন, আপনি ওকে যা শেখাচ্ছেন, তার উলটোটা যেন অন্য কেউ না শেখায়।

ডিসিপ্লিন সংক্রান্ত নিয়মকানুনের ব্যাপারে নির্দিষ্ট ইন্সট্রাকশন দিন। ‘দুষ্টুমি কোরো না’-র বদলে বলুন ‘এখানে বসে প্লিজ় আমাকে একটু হেলপ করো’। বা ‘দৌড়ে রাস্তা পার হয়ো না’ না বলে বলুন ‘আমার হাত ধরো। চলো একসঙ্গে রাস্তা পার হই।’

বাড়ির নিয়মকানুন মানার জন্যে কখনও গায়ে হাত তুলবেন না। আপনার দেখাদেখি বাচ্চাও কিন্তু ওর থেকে ছোট ছেলেমেয়েদের মারতে শিখবে। বরং কথা না শুনলে ওকে কাছে ডেকে বসান। ওর সঙ্গে কথা বলে বোঝাতে চেষ্টা করুন কেন কাজটা করা ঠিক হয়নি। ওকেই বলুন ঠিক করতে কী শাস্তি ওর পাওয়া উচিত। খুব রাগ, বিরক্তি হলেও এই সময়ে মাথা গরম করবেন না। সবার সামনে ওকে শাস্তিও দেবেন না। এতে ওর আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে এবং জেদ চেপে যাবে।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার সন্তান স্বাধীনচেতা হয়ে পড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক! সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মকানুনও একটু একটু করে বদলান। ওকে বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও দিন।

বড়দের মতো বাচ্চাদের জীবনেও অনেক স্ট্রেস আর টেনশন থাকে। সেই বাড়তি চাপ সামলাতে না পেরে অনেক বাচ্চা অবাধ্যতা করে। এই সমস্যা এড়ানোর জন্যে স্কুলের টিচারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। স্কুলে ও কেমন বিহেভ করে বা ব্যবহারে কোনও অস্বাভিকতা আছে কি না জেনে নিন। পাড়ায় যেসব বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ও মেশে, তাদের মাঝে মাঝে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করুন যাতে ওদের সম্বন্ধে আরও ভাল করে জানতে পারেন। সংসারের বা বাইরের কাজে ব্যস্ত থাকলেও বাচ্চাকে নিয়ম করে খানিকটা সময় দিন। অনেক সময় দুষ্টুমি করেও বাচ্চারা নজর কাড়ার চেষ্টা করে।

স্মার্ট পেরেন্টিং

বাচ্চা অবাধ্য হলে যেমন শাস্তি দেন, তেমনি ভাল ব্যবহার করলে প্রশংসা করতে ভুলবেন না। মাঝে মাঝে ছোটখাটো উপহার দিলে ও আরও উৎসাহিত হবে।

বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দিন। ওকে ভাল করে বুঝতে পারলে, ও কেন দুষ্টুমি বা অব্যধ্যতা করছে সহজেই বুঝতে পারবেন। যুক্তি দিয়ে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করুন কেন ওর কাজটা ঠিক নয়। একবার না শুনলেও, আস্তে আস্তে ও ঠিকই বুঝতে শিখবে।

হাতে অঢেল সময় কীভাবে খরচ করবে বুঝতে না পেরে, অনেক সময় বাচ্চারা দুষ্টুমি করে। ছোট থেকেই বাচ্চাকে খেলাধুলোয় উৎসাহিত করুন। পাড়ার কোনও ক্লাব বা স্পোর্টস কোচিং সেন্টারে এনরোল করিয়ে দিতে পারেন। ছবি আঁকা, নাচ, গান, লেখালিখি করতেও উৎসাহ দিন। পড়াশোনার অবসরে যাতে ও সময়টা দুষ্টুমি করে নষ্ট না করে।

একটু-আধটু দুষ্টুমি না করলে শৈশব ঠিকমতো উপভোগই করতে পারে না শিশুরা। কড়া ডিসিপ্লিনের বেড়াজলে ওদের বেঁধে না রেখে শুধু খেয়াল রাখুন ওরা দুষ্টুমির মাধ্যমে নিজের বা অন্য কারওর ক্ষতি করছে কি না।

facebook
facebook