Your child
Sananda fashion

কানে ইনফেকশন

বাচ্চাদের কানের ইনফেকশন নিয়ে জানালেন ইএনটি স্পেশালিস্ট ডা. প্রবাল চট্টোপাধ্যায়।

g

বাচ্চাদের কানের বিভিন্ন সমস্যায় মা-বাবদের প্রায়শই বেশ চিন্তায় পড়তে হয়। এর মধ্যে সবথেকে কমন সমস্যা বোধহয় কানে ইনফেকশন। সর্দিকাশি থেকে শুরু করে সুইমিং পুলের দূষিত জল, নানা কারণ থেকেই বাচ্চাদের কানে ইনফেকশন হতে পারে। পরিণতি কানে ব্যথা, জ্বর, কানের ভারী-ভারী ভাব। সমস্যাগুলো আপাতভাবে খুব একটা গুরুগম্ভীর না হলেও ঠিকসময়ে এগুলোর চিকিৎসা দরকার। অতি পরিচিত সমস্যা বলে হেলাফেলা না করে, এই ধরনের সমস্যায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এতে যথাযথভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। পরবর্তীকালে কানের অনেক জটিল সমস্যাও দূরে রাখা যায়। কানের তিনটে ভাগ রয়েছে। এক্সটার্নাল, মিডল ও ইন্টারনাল। এর মধ্যে সাধারণত এক্সটার্নাল ও মিডল ইয়ারে ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এক্সটার্নাল ও মিডল ইয়ার ইনফেকশন নিয়েই এবারের আলোচনা।

এক্সটার্নাল ইয়ার ইনফেকশন

এক্সটার্নাল ইয়ারে ইনফেকশন হওয়ার প্রধান কারণ হল ফোঁড়া।

এক্সটার্নাল ইয়ার ইনফেকশনের মধ্যে বাচ্চাদের মধ্যে ভীষণভাবে দেখা যায় সুইমিং পুল ওয়াটার থেকে ইনফেকশন। এই ইনফেকশনটার নাম ওটাইটিস এক্সটার্না। সুইমিং পুলের জল যদি ভাল না হয়, তা হলে বর্ষাকালে এর থেকে প্রায়শই কানে ইনফেকশনের সমস্যা হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাক্টেরিয়াল সংক্রমণের জন্যেও ইনফেকশন হয়। বর্ষায় ফাংগাল ইনফেকশনও বেশ কমন।

এক্সটার্নাল ইয়ার ইনফেকশন হওয়ার আর একটি কারণ হল ঘন ঘন কান খোঁচানো। এটা খুবই খারাপ অভ্যেস। ক্লিপ, পেনসিল বা সেফটি পিন দিয়ে যেন কান খোঁচানো না হয়।

অনেকসময় ইনফেকশন ছাড়া অন্য কারণেও কানে ব্যথা হতে পারে। যেমন কান ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে ওয়্যাক্স (খোল) জমে যেতে পারে। ওয়্যাক্স খুব শক্ত হয়ে গেলে, সাতদিন টানা ইয়ার ড্রপ দিয়ে তাকে নরম করতে হয়। তারপর ডাক্তার হয় ওয়াশ নয়তো সাকশন পদ্ধতি ব্যবহার করে কান পরিষ্কার করে দেন। যদি কানের খোল ঠিক সময়ে পরিষ্কার না করা হয়, বা অহেতুক খোঁচানো হয়, তা হলে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে বাচ্চা কানে নাও শুনতে পারে।

লক্ষণ ও চিকিৎসা

কানে ফোঁড়া হলে বাচ্চাদের কানে খুব ব্যথা হয়, কানটা বাইরে থেকে দেখে ফোলা মনে হতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে জ্বরও আসতে পারে। সাধারণত ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থেকে ফোঁড়া হয়। এর ট্রিটমেন্ট হিসেবে বাচ্চার কানে ইয়ার ড্রপ দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধও খেতে হয়। সঙ্গে দরকার হলে পেনকিলার দেওয়া হয়।

সুইমিং পুলের জল থেকে ইনফেকশন হলে বাচ্চার কানে ব্যথা হয়, কান থেকে রস বেরয়, কান ভারী-ভারী মনে হয়। এই ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া জরুরি। দরকারে পেনকিলারও দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সাকশন পদ্ধতি ব্যবহার করে কান পরিষ্কার করা উচিত। এতে কানের ভিতরের ময়লা পরিষ্কার হয়ে যায়। ওটাইটিস ইনফেকশনে সাধারণত কানের পর্দা ঠিকই থাকে। কিন্তু অতিমাত্রায় ইনফেকশন হলে কানের পর্দায় ঘা হতে পারে। তখন অ্যান্টিবায়োটিক, ইয়ার ড্রপ দেওয়া ও সাকশন ক্লিয়ারেন্স করা হয়। বাচ্চাদের কোনও সুইমিং পুলে নিয়ে যাওয়ার আগে অবশ্যই দেখে নিন পুলের জল কতটা পরিষ্কার, নিয়মিত ক্লিনিং করা হয় কি না। সব জেনেই তবেই ভর্তি করার কথা ভাবুন।

কান খোঁচানোর জন্যে সেফটি পিন, ক্লিপ এগুলো প্রত্যেকটাই নোংরা জিনিস। এর থেকে স্কিনে মাইক্রোট্রমা (ত্বকে ক্ষত) হয়, তার থেকেও ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভাল কোম্পানির ইয়ার-বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করুন। কান খোঁচানোর অভ্যেস থাকলে কমাতে হবে। আর প্রতিরোধ হিসাবে আগে থেকে একটা টিটেনাসের ইনজেকশন নিয়ে নেওয়া ভাল। এর সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রয়োজনে পেনকিলার দেওয়া হয়।

মিডল ইয়ার ইনফেকশন

এই ধরনের ইনফেকশন বাচ্চাদের মধ্যে খুব কমন। ডাক্তারি পরিভাষায় একে অ্যাকিউট সাপোরেটিভ ওটাসিস মেডিয়া (এএসওএম) বলা হয়। সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি থেকে ইনফেকশন মিডল ইয়ারে (মধ্য কর্ণে) ছড়িয়ে যেতে পারে।

লক্ষণ ও চিকিৎসা

কানে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। কান ভারী হয়ে যায়। জ্বর হতে পারে। সঙ্গে সর্দিকাশি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা হয়। যদি ঠিক সময়ে চিকিৎসা না করানো হয়, তা হলে কানের পর্দায় ফুটো হয়ে রক্ত বা পুঁজ বেরতে পারে। তবে এতে চিন্তার কিছু নেই। ডাক্তার দেখালে পর্দার ফুটো সেরে যায়। ঠিক সময়ে ট্রিটমেন্ট করালে ৯০% ক্ষেত্রেই এই অসুখ সেরে যায়। মিডল ইয়ার ইনফেকশন থেকে লং-টার্ম ড্যামেজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ট্রিটমেন্টের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও সর্দির ওষুধ খাওয়া জরুরি। সঙ্গে কানে ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। জ্বর বা ব্যথার জন্যে পেনকিলার দেওয়া হয়। এই অসুখ কিন্তু সংক্রামক। একজন বাচ্চা থেকে আর একজন বাচ্চার মধ্যে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ইনফেকশন ছড়িয়ে যেতে পারে।

মিডল ইয়ার ইনফেকশন যদি ক্রনিক হয়ে যায়, তা হলে কানের পর্দায় ফুটো হয়ে যেতে পারে। বাচ্চা কম শোনে, এবং বছরে একাধিবার ঠান্ডা লাগার সঙ্গে কান দিয়ে জল বা পুঁজ বেরয়। ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করলে জল শুকিয়ে যায় ঠিকই, তবে পর্দার ফুটো জোড়া লাগে না। সেই ক্ষেত্রে মাইক্রোসার্জারি করে পর্দার ফুটো জুড়তে হয়। সাধারণত ১২ বছরের পর এই অপারেশন করা হয়, কারণ তার আগে করালে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনায় অনেক কম। যেসব বাচ্চার ঘন ঘন গলায় ব্যথা (টনসিলাইটিস) হয় বা যাদের নাক বন্ধ থাকার কারণে মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিতে হয় (অ্যাডেনয়েড এনলার্জমেন্ট), তাদের ক্ষেত্রে কানে ব্যথা ও ইনফেকশন খুব কমন। এইসব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকার জন্য কানের চিকিৎসার সঙ্গে টনসিল বা অ্যাডেনয়েড অপারেশন করাতে হতে পারে।

facebook
facebook